ইসলামিক এডুকেসন এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেসন


IERF এর দ্বারা বুঝায় Islamic Education and Research Foundation ( ইসলামিক শিক্ষা এবং গবেষণা ফাউন্ডেশন )। এটি একটি রাজনীতি মুক্ত আন্তর্জাতিক ইসলামিক শিক্ষা , গবেষণা, সমাজ সেবা, এবং দাওয়া প্রতিষ্ঠান। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কোর'আন এবং সুন্নাহ এর আলোকে সঠিক ইসলামিক জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।  রাসুল(সঃ) যে ভাবে ইসলাম পালন করেছেন, শিখিয়েছেন এবং তাঁর সাহাবীরা (রা) যে ভাবে তা অনুসরণ করেছেন, আমরাও ঠিক সে ভাবে ইসলামকে জানতে চাই এবং তা পালন করতে চাই, আর আমরা আপনাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবো ইনশা আল্লাহ্‌।

আমাদের এই ওয়েবসাইটিতে পাবেন ইসলামিক লাইব্রেরি, প্রবন্ধ, অডিও লেকচার, ভিডিও লেকচার, প্রশ্ন/উত্তর, বিভিন্ন প্রোগ্রাম, ইভেন্ট ইত্যাদি। আমাদের এখানে আরো পাবেন একটি অনলাইন ক্লাস রুম যা ২৪ ঘণ্টা খোলা আছে এবং এতে লগিন করে আপনি দেশ-বিদেশ এর অনেক শাইখদের লেকচার লাইভ শুনতে পারবেন এবং সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবেন ইনশা আল্লাহ। আমাদের সাইট এ শাইখদের তালিকা এবং তাদের অনলাইন লেকচার এর সময় সূচি দেখে নিন এবং আর দেরি না করে আজই ইসলামিক অনলাইন ক্লাস রুমে যোগ দিন।

আসুন আমরা কোর'আন ও সুন্নাহ এর আলোকে জীবন পরিচালনা করি এবং বিদাত, শিরক ও কুফরি মুক্ত ইসলাম পালন করি। আমিন

লাইব্রেরী

  • ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম

    লেখক : মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (১৭ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (৪,৫,৬,৭ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (৮,৯,১০,১১ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (১,২,৩ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (১২ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (১৩ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

  • তাফসীর ইবনু কাসীর (১৪ খন্ড)

    লেখক : ড. অধ্যাপক মুজীবুর রহমান

    ডাউনলোড

আরো দেখুন >>

  • প্রশ্ন : আমি এবং আমার দুই বান্ধবী ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য মসজিদে যেতে চাই; কিন্তু তারা দুজন পর্দা করে না। তাদের জন্য কি নিজেদের অভ্যস্ত পোশাকের সঙ্গে কেবল ওড়না পেচিয়ে মসজিদে যাওয়া জায়েয হবে?

    লেখক: শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ

    বিষয়শ্রেণী: ফিকাহ্

    উত্তর দেখুন

  • প্রশ্ন : মাসের শুরু ও শেষ জানার জন্য জ্যোতির্বিদ্যার উপর নির্ভর করা কি বৈধ ? চাঁদ দেখার জন্য নতুন আবিষ্কৃত যন্ত্র ব্যবহার করা কি বৈধ ? না খালি চোখে চাঁদ দেখা জরুরি ?

    লেখক: শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ

    বিষয়শ্রেণী: রোযা

    উত্তর দেখুন

  • প্রশ্ন : আমি ছুটি কাটাচ্ছিলাম। ছুটিকালীন সময়ে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা নগরী সফর করি। মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারাতে যাই। সেখানে আমি রমজানের দিনের বেলায় আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করেছি; কিন্তু কোন বীর্যপাত হয়নি। প্রশ্ন হলো- এজন্য আমার উপর কি কোন কিছু আবশ্যক হবে? যদি আমার উপর কিছু আবশ্যক হয়ে থাকে আমার জানা মতে সেটা এই ক্রমধারায় আবশ্যক হয়- একজন দাসমুক্তি; আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এটা পালন করা আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। অথবা একাধারে দুই মাস সিয়াম পালন; আমার ফিল্ড ওয়ার্কধর্মী চাকুরী ও গ্রীষ্মের তীব্র গরমের কারণে এটা পালন করাও আমার জন্য ক িন। তবে কি আমি ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াবো? আমার স্ত্রীর উপরও কি একই জরিমানা আবশ্যক হবে, যদি সে সহবাসের প্রস্তাবে রাজি থাকে? এখানে উল্লেখ্য যে, আমি রিয়াদের অধিবাসী। কিন্তু মদিনাতে আমার একটি বাড়ি আছে। ছুটি কাটাতে আমি মদিনাতে যাই।

    বিষয়শ্রেণী: রোযা

    উত্তর দেখুন

  • প্রশ্ন : তারাবীর সালাতে ইমামের পেছনে মুক্তাদির কুরআন ধরে রাখা কি জায়েয?

    লেখক: আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

    বিষয়শ্রেণী: সালাহ/নামায

    উত্তর দেখুন

  • প্রশ্ন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত হওয়া সত্ত্বেও কেন মুসলমানেরা ইতিকাফ করা ছেড়ে দিয়েছে? ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্যই বা কি?

    বিষয়শ্রেণী: ইসলাম

    উত্তর দেখুন

  • প্রশ্ন : রমজানের আগে আমার স্ত্রী বিগত রমজান মাসের কিছু কাযা রোযা পালন করছিলেন। এমতাবস্থায় আমি তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়েছি। সে সবগুলো রোযা কাযা করতে পারেনি। বিঃ দ্রঃ সে পূর্বেই আমার কাছে রোযা পালনের অনুমতি চেয়েছিল এবং আমি তাকে অনুমতি দিয়েছিলাম।

    বিষয়শ্রেণী: রোযা

    উত্তর দেখুন

আরো দেখুন >>

  • ইসলাম সম্পর্কে জানা

    বক্তা : শাইখ সালাহ্উদ্দিন আহমাদ

    Download

  • কুফর ক্লাস লেকচার-১

    বক্তা : শাইখ সাইফুদ্দিন বিলাল

    Download

  • আরবী ভাষা শিক্ষা কোর্স : ক্লাস নং - ৬

    বক্তা : মোঃ অলিউল্লাহ

    Download

  • আরবী ভাষা শিক্ষা কোর্স : ক্লাস নং - ৫

    বক্তা : মোঃ অলিউল্লাহ

    Download

  • প্রশ্ন ও উত্তর পর্ব ১

    বক্তা : শাইখ মতিউর রাহমান মাদানী

    Download

  • কারবালায় কি ঘটেছিল?

    বক্তা : শাইখ সাইফুল ইসলাম মাদানী

    Download

আরো দেখুন >>

আরো দেখুন >>

প্রবন্ধ

বিষয়শ্রেণী: দাওআত

লেখক: ড. আবু আমীনাহ্‌ বিলাল ফিলিপ্‌স্‌

মূল- ড. আবু আমীনাহ্‌ বিলাল ফিলিপ্‌স্‌ | ভাষান্তর : আব্‌দ আল-আহাদ | সম্পাদনা : শাদমান সাকিব

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের জন্য যিনি তার দ্বীনের পথে মানুষকে আহ্বানকারীদের অশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

“ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম যে আল্লাহ্‌র দিকে মানুষকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলেঃ আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” (৪১:৩৩)

অতঃপর দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক প্রিয় নবী (সা) এর উপর যিনি আমাদের আদর্শ এবং যিনি বলেছেনঃ

“যে কেউ কোন ভাল কাজ করলে ভাল কাজে আহ্বানকারী ব্যক্তিও তার সমপরিমাণ পুণ্য লাভ করবে।”

 

মুসলিমরা জানে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন তাদেরকে একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামকে তাদের জীবন বিধান হিসেবে দান করে তাদের সম্মানিত করেছেন এবং একই সাথে ইসলামকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আরোপ করেছেন। আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

(কোরআন) তোমার ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্যে তা সম্মানের বস্তু; তোমাদের অবশ্যই এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে।[৪৩:৪৪]

 

তারা এটাও জানে যে, যদি তারা তাদের ইসলাম প্রচারের এই দায়িত্বকে পালন করে এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে চলার ক্ষেত্রে অন্যের হেদায়াতের কারণ হয় তাহলে তারা তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এমন প্রতিদান প্রাপ্ত হবে যা তারা কল্পনাও করতে পারেনা। এ বিষয়ে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

“তুমি বলে দাওঃ আল্লাহ্‌র এই দান ও রহমতের (কোরআনের) প্রতি সকলেরই আনন্দিত হওয়া উচিৎ; এটা পার্থিব সম্পদ হতে বহুগুণ উত্তম যা তারা সঞ্চয় করেছে।” [১০:৫৮]

এবং প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) বলেনঃ

“আল্লাহ্‌ যদি কাউকে হেদায়াত দিয়ে পথ দেখান তাহলে এই হেদায়াত পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার চেয়েও বেশী মুল্যবান।”

 

এটা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের এক সুস্পষ্ট অনুগ্রহ যে তিনি তাঁর দ্বীনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার অগণিত পথ আমাদের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছেন। প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করে তাদের স্রষ্টার কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ নিতে পারেন। মানুষকে ইসলামের পথে দা’ওয়াহ্‌ দিতে হবে এমন পদ্ধতিতে যা মানুষের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং গ্রহণযোগ্য। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন দা’ঈকে তাঁর দা’ওয়াহ্‌র পদ্ধতিও বদলানো লাগবে। আর ঠিক এই কাজটাই করেছিলেন নবী নূহ্‌ (আ) এবং তাঁর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ।

 

একজন দা’ঈর দায়িত্ব হল মানুষকে ইসলামের পথে ডাকার সবরকম পন্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা। এতে করে দা’ওয়াহ্‌র কাজ করা তার জন্য অনেক সহজ হবে। একজন দা’ঈকে তার নিজ পরিবারের আপনজন থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বাড়ীতে কাজের লোকসহ প্রতিটি মানুষকেই ইসলামের দা’ওয়াহ্‌ দিতে হবে। তাকে জানতে হবে কোথায়, কখন এবং কিভাবে ইসলামের দা’ওয়াহ্‌ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ স্থানের তালিকায় থাকবে মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, জেলখানা, পার্ক, সমুদ্র সৈকত, বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র, হাজী ক্যাম্প, আবাসিক হোটেল, এয়ারপোর্ট, বাস টার্মিনাল, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং সেন্টার, বাজার এলাকা, অফিস আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া, খাবার হোটেল-রেস্তরা ইত্যাদি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমনঃ পাসপোর্ট অফিস, পোস্ট অফিস, পর্যটন কেন্দ্র, বিভিন্ন তথ্য প্রদানকারী সংস্থা ইত্যাদিও তার ইসলামি দা’ওয়াহ্‌র ক্ষেত্র হতে পারে।

 

ইসলামের দা’ওয়াহ্‌র কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে একে অন্যের কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে ইসলামি দা’ওয়াহ্‌র কাজে নিয়োজিত কর্মীরা আরো দক্ষ এবং সৃজনশীল হয়ে উঠবেন। ফলে দা’ওয়াহ্‌ কার্যক্রমকে আরো সফলভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। পারস্পারিক উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমের ইসলামের সত্যবাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজ চালিয়ে যেতে হবে। মানুষকে দা’ওয়াহ্‌ দেয়ার ক্ষেত্রে একজন দা’ঈকে প্রয়োজনীয় সবরকম দা’ওয়াহ্‌ উপকরণকে কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইসলাম নিয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের নিয়োগ দিয়ে হবে। তাদের সাথে যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি প্রিন্ট করে সেগুলো বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি ইসলামিক সিডি ও ভিসিডির কপি তৈরি করে সেগুলো বন্ধুমহলে এবং চারপাশের মানুষদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

 

অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না কিভাবে ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌র কাজ শুরু করবেন। অনেকেই আবার অজ্ঞতার ওজুহাতে দেখিয়ে কিছু না করেই দিন পার করে যাচ্ছেন। নিচে আমরা ৮০ টিরও বেশী উপায় সম্বলিত একটি পরামর্শ তালিকা দিচ্ছি। পরামর্শগুলো কাজে লাগিয়ে আপনারা সহজেই ইসলামকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন ইনশাআল্লাহ্‌-

 

পরিবারে দা’ওয়াহঃ

১. পারিবারিক গ্রন্থাগারঃ পরিবারে সকল সদস্যদের বয়স বিবেচনা করে সে অনুযায়ী বাড়ীতে বিভিন্ন ইসলামিক বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা এবং ইসলামিক বক্তাদের লেকচারের সিডি-ভিসিডির একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলুন। আপনার আত্মীয় স্বজনদের বলুন তারা আপনার বাসা থেকে সেগুলো নিয়ে বাসায় পড়তে।

 

২. ওয়াল পোস্টারঃ বাড়ীতে একটি নির্ধারিত স্থানকে নোটিশ বোর্ডের মত পোস্টার লাগানোর জন্য ব্যবহার করুন। গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক লেকচার, বিভিন্ন প্রোগ্রামের সময়সূচী ইত্যাদি পরিবারের সবাইকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য ওয়াল পোস্টারের স্থানটিকে ব্যবহার করুন।

 

৩. পারিবারিক শিক্ষার আসরঃ পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে কেউ একজন কোন একটি বই থেকে সকলের উদ্দেশ্যে পড়ুন এবং বাকিরা শুনুন।যেমন কিতাবুত তাওহীদ।   এক্ষেত্রে একসাথে বসে ইসলামিক লেকচার শুনতে পারেন অথবা কোরআনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আয়াত এবং গুরুত্বপূর্ণ হাদীসগুলোও মুখস্ত করতে পারেন।

 

৪. পারিবারিক প্রতিযোগিতাঃ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নানা রকম ইসলামিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন যা তাদেরকে ইসলাম মেনে চলার ক্ষেত্রে আরো বেশী অনুপ্রেরণা দেবে। পুরস্কার হিসাবে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণদের নামসমূহ পারিবারিক সম্মাননা তালিকার শীর্ষে রাখা যেতে পারে। তালিকার শীর্ষে নিজের নাম থাকাটাই তাদের কাছে অনেক বড় পুরস্কার মনে হবে।

 

৫.পারিবারিক ম্যাগাজিনঃ বাড়ীতে একটি পারিবারিক ম্যাগাজিন প্রকাশের ব্যবস্থা করুন। এতে পরিবারের বিভিন্ন সদস্যরা ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন আর্টিকেল লিখবে। কুরআনের আলো ওয়েবসাইট থেকেও তারা ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ বা ছবি সংগ্রহ করে এই ম্যাগাজিনে প্রকাশ করতে পারে।

 

৬. ইসলামিক সমাজ কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণঃ সালাত আয়াদের জন্য মসজিদে যাবার সময়, ইসলামিক লেকচার শুনতে যাবার সময় অথবা কোন অসুস্থ কাউকে দেখতে যাবার সময় সাথে আপনার ভাই বা সন্তানদের নিয়ে যান। ইসলামি দাওয়াহ্‌র কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সংগঠনগুলোতেও তাদেরকে আপনার সাথে নিয়ে যান।

 

৭. অন্যদের সামনে ভাল কাজঃ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সামনেও কিছু ভাল কাজ করুন যাতে তারা আপনাকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, তাদের সামনে সালাত আদায় করুন, কোরআন তেলাওয়াত করুন, গরীব দুঃখীদের দান সাদাকা করুন ইত্যাদি।

 

মসজিদে দা’ওয়াহঃ

৮. দেয়াল ম্যাগাজিনে অংশগ্রহণঃ অধিকাংশ মসজিদের পেছনের দিকের দেয়ালে নোটিশ বোর্ড থাকে যা বিভিন্ন ধরনের ঘোষণা, ইসলামিক পোস্টার ইত্যাদি লাগানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই নোটিশ বোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল পোস্ট করতে পারেন অথবা মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে সচেতন করে এমন তথ্যমূলক পোস্টার কিনে লাগাতে পারেন। কুরআনের আলো ওয়েবসাইট থেকেও আপনারা প্রবন্ধ প্রিন্ট, করে আপনার এলাকার মসজিদে লাগাতে পারেন।

 

৯. মসজিদের সুযোগ সুবিধা এবং অনুষ্ঠানের উন্নয়নঃ মসজিদে দা’ওয়াতের কার্যক্রম এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মসজিদের পাঠাগার ও হিফয্‌খানার উন্নয়নের কাজে অংশগ্রহন করুন। দান বাক্সের মাধ্যমেও উক্ত কাজে সহায়তা করতে পারেন।

 

১০. ইসলামিক বই-পুস্তক এবং অডিও/ ভিডিও সিডি/ডিভিডি সরবরাহঃ বিভিন্ন ইসলামিক কল্যাণমূলক সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, ইসলামিক লেকচার, প্রামাণ্যচিত্রের অডিও/ভিডিও সিডি/ডিভিডি ইত্যাদি সংগ্রহ করে মসজিদের বিভিন্ন স্থানে রাখুন যাতে মুসল্লিদের দৃষ্টিগোচর হয়। যেমনঃ কোরআনের পাশাপাশি তার একাধিক অনুবাদসহ তাফসীর গ্রন্থগুলো মসজিদের সেলফে রাখা যেতে পারে।

 

১১. মসজিদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনা অনুষ্ঠান সম্পর্কে লোকজনকে জানানোঃ মসজিদে কখন কোন বিষয়ের উপর লেকচারের আয়োজন করা হয়েছে অথবা কোন সময় কোরআন শিক্ষার ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইত্যাদি জানিয়ে মসজিদের নোটিশ বোর্ড কিংবা দরজায় বিজ্ঞাপন দিন।

 

১২. লেকচারের আয়োজন করাঃ আপনার পরিচিত বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন আকীদার বক্তাদের লেকচার দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে মসজিদে নিয়ে আসুন। এক্ষেত্রে অন্যান্য দা’ওয়াহ্‌ সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ করে তাদের কাছ থেকে আথবা কুরআনের আলো ওয়েবসাইট থেকেও ভিডিও লেকচার সংগ্রহ করে, প্রোজেক্টরের মাধ্যমে লোকদের দেখানোর ব্যবস্থা করতে পারেন।

 

১৩. জুম’আর খুৎবা পর্যালোচনাঃ জুম’আর দিন ইমাম যে খুৎবা দেন তার বিষয়বস্তু নিয়ে লোকজনের সাথে পর্যালোচনা করুন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুৎবার প্রাসঙ্গিকতা বিচার করে তা বাস্তবায়নের জন্য লোকদের উৎসাহিত করুন।

 

১৪. মসজিদ কমিটিতে অংশগ্রহণঃ ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌র পাশাপাশি অন্যান্য কল্যাণমূলক সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করার জন্য মসজিদ কমিটির কর্মী হিসেবে অংশগ্রহন করুন।

 

১৫. ইমামের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুনঃ আপনার মসজিদের ইমামের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুন। আপনি তাকে Youtube অথবা আমাদের ওয়েবসাইটের বিভিন্ন লেকচার তাকে দেখাতে পারেন বা শোনাতে পারেন। Youtubekhalifahklothing, shaykha, quraneralo - এই চ্যানেলগুলোতে অনেক ভালো ইংলিশ/বাংলা লেকচার পাবেন। এই লেকচার গুলো তাদের দেখাতে পারেন। তারা এই লেকচার গুলো নিয়ে জুম্মা তে খুৎবা দিতে পারবেন। (উপরের চ্যানেলগুলো দেখার জন্য নির্দিষ্ট চ্যানেলটির উপর ক্লিক করুন)

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দা’ওয়াহঃ

১৫. সকালের পিটি-প্যারেডঃ বিভিন্ন দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ যেমনঃ ইসলামিক বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন, লেকচারের অডিও/ ভিডিও সিডি ইত্যাদি প্রস্তুত রাখুন এবং সকালের পিটি প্যারেডে পরিস্থিতি বুঝে কাজে লাগান।

 

১৬. স্কুলের নোটিশ বোর্ডঃ এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ এর পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামিক লেকচার, সভা-সেমিনার ইত্যাদির বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য আকর্ষণীয় সব পোস্টার তৈরি করে সেগুলো নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে দিতে পারেন।

 

১৭. নাট্য কর্মকাণ্ডঃ ইসলামিক ভাবধারা এবং ইসলামিক মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করে এমন নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করুন।

 

১৮. বক্তৃতা-ভাষণঃ স্কুলে ইসলামের বিশেষজ্ঞ বক্তাদের নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করুন। অনুষ্ঠানে ছাত্ররা যাতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এতে করে ছাত্ররা তাদের করা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তর পেলে ইসলাম তাদের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

 

১৯. বিভিন্ন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানঃ স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক এবং কর্মচারীদের নিয়ে বিভিন্ন ইসলামিক এবং শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন। বিজয়ীদের মাঝে ইসলামিক পুরস্কার বিতরণ করুন। প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানগুলোতে দা’ওয়াহ্‌র গুরুত্ব তুলে ধরে বিভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপন করুন।

 

২০. ছাত্রদের স্বার্থরক্ষাঃ ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ, পরামর্শ, অভিযোগ ইত্যাদি সংগ্রহ করে সেগুলো স্কুল কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করুন। বিশেষ করে ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহায়তা দিন।

 

২১. ইসলামিক গ্রন্থাগারঃ স্কুলের সাধারন গ্রন্থাগারকে ইসলাম বিষয়ক বই-পুস্তকের একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তুলতে “ইসলামিক স্টাডিজ” বিভাগকে সহায়তা করুন। এখানে ইসলামিক সাহিত্যের পাশাপাশি রাসূল (সা) এর সাহাবীদের (রা) এবং ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ মুসলিমদের জীবনচরিতগুলোও যাতে পাওয়া যায় সে ব্যবস্থা করুন।

 

২২. বিভিন্ন প্রচার-প্রদর্শনীঃ স্কুল কর্তৃপক্ষ আয়োজিত বিভিন্ন বইমেলা, ভিডিও প্রদর্শনী কিংবা বিভিন্ন মাদক বিরোধী প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করুন।

 

২৩. ইসলামিক সপ্তাহ উদ্‌যাপনঃ স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করুন যেন তারা বছরে একটি দিন ইসলামিক সপ্তাহ হিসেবে উদ্‌যাপনের অনুমতি দেয়। এমন অনুষ্ঠানগুলোতে নানা রকম ইসলামিক প্রদর্শনীর আয়োজন থাকবে। ইসলাম সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারনা দূর করে এমন স্লোগান খোচিত আকর্ষণীয় পোস্টার, ক্যালেন্ডার, আরবি ভাষা শিক্ষার সফটওয়্যার, কোরআনের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা সম্বলিত সফটওয়্যার, কোরআনের তেলাওয়াত, ইসলামিক লেকচার, প্রামান্যচিত্রের সিডি-ভিসিডি ইত্যাদি হবে প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণ।

 

২৪. গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে দা’ওয়াহঃ ছুটিতে পড়াশোনার চাপ কম থাকলে সময়টা কাটাতে পারেন বন্ধুমহলে সামনে ইসলামকে তুলে ধরার মাধ্যমে। তাদের সাথে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করুন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাদের কি মত তা জেনে নিয়ে ইসলামে এসবের সমাধান কি তা তাদের সাথে শেয়ার করুন।

 

কর্মক্ষেত্রে দা’ওয়াহঃ

২৫. দা’ওয়াহ্‌ পোস্টারঃ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর আকর্ষণীয় ও নজরকাড়া পোস্টার তৈরি করে অফিসের নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে দিন। কোথাও কোন ইসলামিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকলে সেটাও বিজ্ঞাপন আকারে নোটিশ বোর্ডে লাগাতে পারেন।

 

২৬. নিজের বসার টেবিলঃ আপনার অফিসের টেবিলে সবসময় কিছু না কিছু দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ রাখুন। যেমনঃ ইসলামিক পুস্তিকা, ম্যাগাজিন, কোরআনের উপদেশ সম্বলিত পেপার ওয়েট ইত্যাদি। এতে করে আপনার সহকর্মীরা থেকে শুরু করে আপনার ক্লায়েন্টসদের সকলের নজরে পড়বে ব্যাপারটি। ফলে তাদের সাথে মুখের কথা খরচ না করেই অনেকখানি দা’ওয়াহ্‌র কাজ হয়ে যাবে। আপনাকে দেখে তারাও দা’ওয়াহ্‌র কাজে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।

 

২৭. ইসলামিক লেকচারের সিডি/ডিভিডি বিতরণঃ সহকর্মীদের চালচলন, কথাবার্তা, বয়স ইত্যাদি বিবেচনা করে তাদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক লেকচারগুলো বিতরণ করুন। বিশেষ করে এমন

ধরনের লেকচার তাদের কে শুনতে বা দেখতে দিন যেগুলোর বিষয়বস্তু বা শিরোনাম অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং যেগুলো বস্তুবাদী মানব জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে।

 

২৮. আমন্ত্রণ জানানঃ সহকর্মীদের আমন্ত্রণ করে ইসলামিক আলোচনা অনুষ্ঠান এবং সভা-সেমিনারে নিয়ে যান। তাদেরকে বিভিন্ন ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌ সংগঠনগুলোতেও সাথে করে নিয়ে যান।

 

২৯. জামা’য়াতে সালাত আদায় করুনঃ সহকর্মীদের সাথে নিয়ে অফিসে একসাথে সালাত আদায় করুন অথবা তাদেরকে সাথে নিয়ে পাশের কোন মসজিদেও সালাত আদায়ের জন্য যেতে পারেন।

 

৩০. ইসলামিক আচার-অনুষ্ঠানঃ বিভিন্ন সভা সমাবেশের আয়োজন করুন এবং ইসলামের দা’ঈদেরকে অনুষ্ঠানগুলোতে আমন্ত্রণ করুন। অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি ও বক্তব্য দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে ইসলামকে জানার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি করবে।

 

৩১. উন্মুক্ত আলোচলাঃ দুপুরের খাবার কিংবা চা বিরতির সময়টা খোশগল্পে না কাটিয়ে ইসলামিক আলোচনার উপলক্ষ হতে পারে।

 

৩২. ইসলামিক উদ্যোগঃ ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌র সাথে যারা সক্রিয়ভাবে জড়িত তাদেরকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হাতে নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করুন।

 

৩৩. ইসলামিক দৃষ্টান্তঃ কর্তব্যপালণ এবং কর্মসম্পাদনের ক্ষেত্রে শতভাগ আন্তরিক হউন। আপনার প্রতিটি কর্মই সাধ্যমত করার চেষ্টা করুন এবং অন্যদের চোখে প্রমাণ করুন আপনি যা করেছেন একজন ভাল মুসলিম বলেই তা করেছেন। আর এভাবেই তাদেরকে বোঝান ইসলাম কিভাবে মানুষকে সত্যকার অর্থে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গোড়ে তোলে।

 

দাওয়াহ্‌র কিছু সাধারন পন্থাঃ

৩৪. দা’ওয়াহ্‌ পোস্টারঃ অত্যন্ত দৃষ্টি-আকর্ষক এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের বিভিন্ন দৃশ্যাবলী ব্যবহার করে পোস্টার তৈরি করুন। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বাস্তবিক মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরে সেই পরিস্থিতিতে কিভাবে দা’ওয়াহ্‌ দেয়া যায় তা তুলে ধরুন। পোস্টারগুলোতে মানুষের চিন্তা উদ্রেককারী ইসলামিক স্লোগান লিখে দিন এবং সেগুলোকে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টাঙানোর ব্যবস্থা করুন।

 

৩৫. ইসলামিক শুভেচ্ছা কার্ডঃ বিভিন্ন শুভেচ্ছাবাণী সম্বলিত কার্ড ছাপিয়ে সেগুলো বিতরণ করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক দিন কিংবা অনুষ্ঠানের তারিখ দিয়ে কার্ড ছাপিয়ে সেগুলোও বিতরণ করা যেতে পারে। কার্ডগুলোতে মনোরম অক্ষরে ইসলামে নিষিদ্ধ বিষয় যেমনঃ সুদ, ঘুষ, পরচর্চা, প্রতারণা ইত্যাদির কুফল উল্লেখ করুন।

 

৩৬. দা’ওয়াহ্‌ এ্যালবামঃ পরকাল সম্পর্কে মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারকারী এবং তাদের মনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব ছবি সংগ্রহে রাখুন। ছবিগুলো আপনাদের দা’ওয়াহ্‌ সংগঠনের দর্শনার্থীদের জন্য ব্যবহার করুন অথবা উপহার হিসেবে সেগুলো তাদেরকে দিতেও পারেন।

 

৩৭. বিয়ের কার্ডঃ বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌ পৌঁছে দেয়ার জন্য ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌র প্রচারপত্রের উল্টো পিঠ বিয়ের কার্ড হিসেবে ব্যবহার করুন। উদাহরণস্বরূপ, যে এলাকার লোকজন বিয়ের অনুষ্ঠানে অনৈসলামিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয় সে এলাকার লোকজনদের দা’ওয়াহ্‌ দেয়ার জন্য “ইসলামে বিয়ে অনুষ্ঠানের ‘আদাব” শীর্ষক পুস্তিকা বিয়ের কার্ড হিসেবে ব্যবহার করুন।

 

৩৮. টাইপিং এবং রিভিশনঃ হয়ত কোন কাউকে ইসলামের দা’ওয়াহ্‌ দিতে চাচ্ছেন কিন্তু সরাসরি কিছু বললে কাজ হবে না। সেক্ষেত্রে যা করতে পারেন তা হল, তাকে দিয়ে ইসলামিক কোন আর্টিকেল লেখান বা লেখা আর্টিকেল তাকে প্রুফ রিডিং এর জন্য দিন। এমনি এমনি হয়ত পড়ত না কিন্তু অনুরোধ করে কাজটি করতে বললে করবে এবং এক্ষেত্রে দুই কাজই হবে। লিখতে গিয়ে বা প্রুফ রিডিং করতে গিয়ে সে মনোযোগ দিয়ে পড়বে এবং ইসলামের দাওয়াহ্‌র কাজও হবে।

 

৩৯. মোবাইলের মাধ্যমে দাওয়াহঃ আপনার মোবাইল এবং ই-মেইল কন্ট্যাক্ট লিস্টের সকলকে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক দিন ও অনুষ্ঠানের কথা জানিয়ে এবং মনে করিয়ে দিয়ে মেসেজ পাঠান। ইসলামে দা’ওয়াহ্‌র গুরুত্ব উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত আর্টিকেল লিখে তাদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন। আমাদের ওয়েবসাইটের সব আর্টিকেল ইমেইল করে পাঠাতে পারেন।

 

৪০. ইন্টারনেট দা’ওয়াহঃ বিভিন্ন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের সাইট যেমনঃ Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে ইসলামি প্রবন্ধ, বই, অডিও/ভিডিও লেকচার শেয়ার  করুন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। ।  ইন্টারনেটে এমন অসংখ্য চ্যাট রুম/ব্লগ আছে যেগুলোতে ইসলামের কুৎসা রটনা করা হচ্ছে, ইসলামের নামে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এমন চ্যাট রুম/ ওয়েবসাইট গুলোতে আলোচনায় অংশ নিন এবং তাদের মিথ্যাচারকে খণ্ডন করুন।

 

৪১. গণমাধ্যমে দা’ওয়াহঃ রেডিও এবং টেলিভিশনের জন্য ইসলামিক অনুষ্ঠান নির্মাণ করে সেগুলো সম্প্রচারের ব্যবস্থা করুন। অনুষ্ঠানগুলো সম্প্রচারের আগেই সেগুলোর প্রচার সময় এবং চ্যানেলের নাম উল্লেখ করে ব্যপক প্রচারণা চালান। এক্ষেত্রে পূর্বোল্লিখিত পদ্ধতিতে পোস্টারের মাধ্যমে তা করতে পারেন। ফেইসবুকের সাইডবারেও আকর্ষণীয় ইমেজ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন। স্থানীয় সংবাদপত্রেও ইসলাম বিষয়ক আর্টিকেল লিখে পাঠান।

 

৪২. স্টিকারের মাধ্যমে দা’ওয়াহঃ সালাত আদায় করা, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, দুস্থদের সহায়তা করা ইত্যাদি বিষয়গুলো মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এমন মেসেজ লিখে স্টিকার আকারে সেগুলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ পাবলিক যানবাহন যেমনঃ বাস, ট্রেন ইত্যাদিতে লাগানোর ব্যবস্থা করুন। স্টিকারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দো’য়া যেমনঃ বাড়ীর বাইরে যাওয়ার দো’য়া, বাড়ীতে প্রবেশের দো’য়া, টয়লেটে প্রবেশের দো’য়া ইত্যাদি লিখে মানুষের মাঝে বিতরণ করুন যাতে তারা সেগুলো বাড়ীর যথাস্থানে লাগিয়ে রাখতে পারে। আবাসিক হোটেলের মালিকদের অনুমতি নিয়ে হোটেলের রুমগুলোতে সালাতের জন্য কিব্‌লা উল্লেখ করে আকর্ষণীয় স্টিকার লাগাতে পারেন।

 

৪৩. সালাত এবং সাওমের (রোজা) সময়সূচী প্রচারঃ সালাতের সময়সূচী এবং রমজান মাসে ইফতারের সময়সূচী ছাপিয়ে সেগুলোকে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগানোর ব্যবস্থা করুন। এতে করে মুসল্লীদের এবং যারা রোজা রাখেন তাদের অনেক উপকার হবে। এতে করে সালাতের ব্যাপারে অন্যান্যদেরও স্মরণ করিয়ে দেয়া যাবে।

 

৪৪. দিনপঞ্জি এবং কর্মসূচীঃ গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক দিন এবং কর্মসূচীর তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ করে আকর্ষণীয় দিনপঞ্জি ছাপিয়ে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করুন।

 

৪৫. কলিং কার্ডঃ বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করে ব্যালেন্স রিচার্জ কার্ডের উপরে দা’ওয়াহ্‌ মেসেজ লিখে সেগুলো দোকানে দোকানে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করুন।এতে করে ব্যালেন্স রিচার্জ কার্ডের মাধ্যমেও কাস্টোমারদের কাছে ইসলামের দা’ওয়াহ্‌ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

 

৪৬. পোস্ট কার্ডঃ প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য ব্যবহার করে আকর্ষণীয় পোস্ট কার্ড ডিজাইন করুন। পোস্ট কার্ডের উল্টো পিঠে ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌ সম্পর্কিত মেসেজ লিখে সেগুলো ছাপানোর ব্যবস্থা করুন। উদাহরণস্বরূপ, কোন খেজুর বাগানের মনোরম দৃশ্যকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে তার উপর কোরআনে বর্ণিত “পানি চক্র” সম্পর্কিত আয়াতের উদ্ধৃতি দিতে পারেন।

 

৪৭. দা’ওয়াহ্‌ ব্রিফকেইসঃ বিশেষ ধরনের একাধিক পকেট বিশিষ্ট ব্রিফকেইস কিনে তা কর্মীদের মধ্যে বিতরণ করুন। একাধিক পকেটওয়ালা এমন ব্রিফকেইস বিভিন্ন ধরনের লিফলেট, পুস্তিকা, গুরুত্বপূর্ণ লেকচারের অডিও-ভিডিও সিডি/ডিভিডি ইত্যাদি বহনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।

 

৪৮. পত্রিকার চাঁদাঃ উপহার হিসেবে কাউকে ইসলামিক কোন পত্রিকার চাঁদা পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দিতে পারেন অথবা পত্রিকার চাঁদা পরিমাণ টাকা কোন দা’ওয়াহ্‌ সংগঠনকে পাঠিয়ে দিতে পারেন ফলে তারাই পত্রিকাটি গ্রাহকের কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেবে।

 

৪৯. পঠিত বই-পুস্তক এবং পত্র-পত্রিকা সংগ্রহঃ পড়া হয়ে গেছে এমন বই-পুস্তক এবং পত্র-পত্রিকা সংগ্রহের একটি উদ্যোগ হাতে নিন। সেগুলো সংগ্রহ করে এমন সব এলাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করুন যেখানকার লোকেরা সেগুলো এখনও পড়ার সুযোগ পাইনি।

 

৫০. পুস্তিকা-প্রচারপত্রঃ গুরুত্বপূর্ণ বই বা লেকচারে ভিডিও সিডি/ডিভিডি থেকে নির্বাচিত অংশ ছাপিয়ে পুস্তিকা বা প্রচারপত্র আকারে প্রকাশ করুন। বিভিন্ন উপলক্ষে এমনটি করা যেতে পারে। যেমনঃ হজ্ব মৌসুমে, লম্বা ছুটির ভেতরে, প্রবাসী শ্রমিকদের উপলক্ষে, বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে, রমজান মাস কিংবা ঈদ উপলক্ষে।

 

৫১. বিভিন্ন বিলের রশিদঃ সাধারন ব্যবহার্য বিল যেমনঃ টেলিফোন বিল, পানির বিল, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি বিলের রশিদের উল্টো পীঠে সংক্ষিপ্ত দা’ওয়াহ্‌ বিষয়ক বিবৃতি এবং কোরআনের উপদেশবাণী লিখে তা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিন।

 

৫২. ইসলামিক স্লোগানঃ মানুষের নজর কাড়ে এমন সব আকর্ষণীয় স্লোগান বা বক্তব্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমনঃ ক্যালেন্ডার, শপিংব্যাগ, গাড়ির সানস্ক্রীন ইত্যাদিতে লিখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই শপিংব্যাগ বা গাড়ীর সানস্ক্রীন এর প্রস্তুতকারক কোম্পানির অনুমতি নিতে হবে।

 

৫৩. খোলা চিঠিঃ বিভিন্ন বয়সের মানুষকে পাঠক হিসেবে কল্পনা করে চিঠি লিখুন। মনে করুন, আপনার চিঠির পাঠক হতে পারে মসজিদের পাশের বাড়ীর কেউ অথবা সেই মসজিদের ইমাম, কিংবা একজন পাবলিক স্পিকার, একজন ডাক্তার, একজন শিক্ষক, একজন ছাত্র, একজন প্রকাশক, একজন বাবা, একজন মা, একজন স্বামী, একজন স্ত্রী, একজন চাকুরিদাতা, একজন ব্যবসায়ী, একজন ভোক্তা/ক্রেতা, একজন নিরাপত্তা প্রহরী, একজন কারাবন্দী কয়েদী অথবা একজন মুসাফির। আপনার পাঠককে উদ্দেশ্য করে তার অনুভূতিতে নাড়া দেয় এমন ভাষায় তাকে ইসলামের পথে ডাকুন।

 

৫৪. সাধারন প্রতিযোগিতাঃ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক সাধারন জ্ঞানের প্রতিযোগিতা আয়োজন করুন। এক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের বয়সের কথা মাথায় রেখে বয়সের সাথে মানানসই বিভিন্ন ইসলামিক পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা করুন। পুরুস্কার হিসেবে বিজয়ীদের মধ্যে ইসলামিক বই, লেকচারের সিডি-ভিসিডির সিডি/ডিভিডি ইত্যাদি বিতরণ করুন।

 

৫৫. সাধারন প্রকাশনাঃ আগে হয়ত ইসলাম মেনে চলত না অথবা বিপথে চলে গিয়েছিল পরে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন হেদায়াত দান করেছেন এমন মানুষদের গল্প বা তাদের স্বীকারোক্তিমূলক কথাকে গল্প আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করুন। এধরনের প্রকাশনায় নিয়মিত বিভাগ হিসেবে আরো যা থাকতে পারে তা হল কবিতা, নাটক, ছোট গল্প, ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা, বিখ্যাত লোকদের জীবনী, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট, আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন অবদান ও  আবিস্কারের উপর প্রবন্ধ। প্রকাশনায় এসকল বিভাগ রাখার উদ্দেশ্য হল সেসব পাঠকদের ধরে রাখা যারা হয়ত পুরোপুরি ইসলামিক পত্রিকা পড়তে আগ্রহী নন।

 

৫৬. বিভিন্ন দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ বিতরণঃ ইসালামের দা’ওয়াহ্‌ পৌঁছে দেয়ার কাজে নিয়োজিত সংগঠনগুলো নিয়ম করে সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে দা’ওয়াহ্‌ বিষয়ক পুস্তিকা, ক্রোড়পত্র, লেকচারের সিডি-ভিসিডি ইত্যাদি পৌঁছে দিতে পারে। এমন কাজ স্কুলগুলোতেও করা যেতে পারে।

 

৫৭. প্রোডাকশন কোম্পানীঃ বড় ধরনের অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজন করে থাকে এমন কমিউনিটি সেন্টার বা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। তাদের সহযোগিতায় উপস্থিত অতিথিদের মাঝে দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ যেমনঃ দা’ওয়াহ্‌ পুস্তিকা, বিখ্যাত বক্তাদের আকর্ষণীয় লেকচারের সিডি-ভিসিডি ইত্যাদি বিতরণের ব্যবস্থা করুন।

 

৫৮. দা’ওয়াহ্‌র কাজে ব্যবহারের জন্য গাড়ীঃ দা’ওয়াহ্‌র কাজে ব্যবহারের জন্য হালকা দামের খোলা জীপ গাড়ী কিনতে পারেন। গাড়ীতে দা’ওয়াহ্‌ বিষয়ক এবং উৎসাহমূলক শব্দগুচ্ছ বা বাক্য লিখে দিন। জনসমাগম বেশী হয় এমন জায়গায় গাড়ী পার্ক করে লোকজনের মাঝে পূর্বোল্লিখিত দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ যেমনঃ দা’ওয়াহ্‌ পুস্তিকা, বিখ্যাত বক্তাদের আকর্ষণীয় লেকচারের সিডি-ভিসিডি ইত্যাদি বিতরণ করুন

 

৫৯. বিশালাকৃতির বিল বোর্ডঃ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ন বিজ্ঞাপন বা বিল বোর্ড টাঙিয়ে সেগুলোতে দা’ওয়াহ্‌ মেসেজ এবং ইসলামিক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেয়ার ব্যবস্থা করুন। বিশালাকৃতির বিল বোর্ডগুলো সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হবে। আজকাল রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন প্রসাধনী পণ্যের কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপনের জায়গায় ইসলামিক বিল বোর্ড দেখা গেলে তা লোকজনের মাঝে বৈপ্লবিক সাড়া জাগাবে।

 

৬০. ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজনঃ দা’ওয়াহ্‌ সংগঠনগুলো কিশোর এবং যুবকদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন শারীয়াহ্‌ সম্মত খেলাধুলার আয়োজন করতে পারে। এমন অনুষ্ঠানগুলোতে বিজয়ীদেরসহ দর্শকদের মাঝে দা’ওয়াহ্‌ সংশ্লিষ্ট উপকরণ পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা যেতে পারে।

 

৬১. বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানঃ ইসলামের জন্য কাজ করতে আগ্রহী এমন ডাক্তারদের দিয়ে কোন সমমনা প্রাইভেট ক্লিনিকের অধিনে সাধারন মানুষদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করুন। এক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের মানুষদের সুবিধা দেয়া যেতে পারে। যেমনঃ নতুন মুসলিম হয়েছে অথবা যারা ইসলাম গ্রহনে আগ্রহী ইত্যাদি।

 

৬২. মহিলাদের জন্য কোর্সের আয়োজনঃ মহিলাদের উদ্দেশ্যে এমন সব কল্যাণধর্মী কোর্সের আয়োজন করুন যে ব্যাপারে তারা স্বভাবতই তারা আগ্রহ বোধ করে। যেমনঃ রান্না-বান্না, গারাস্থ্য অর্থনীতি, সন্তান প্রতিপালন, দাম্পত্য জীবন, গৃহ ব্যবস্থাপনা, গৃহকর্ম ও গৃহকর্মী, দাম্পত্য প্রস্তুতি, স্তন্যদান, শিশুদের রোগবালাই, গৃহ নিরাপত্তা, প্রাথমিক চিকিৎসা ইত্যাদি। এইসব কোর্সের পাঠ্যসূচীর বই-পুস্তকের ভিতর দা’ওয়াহ্‌ বিষয়ক মেসেজ সন্নিবেশ করুন।

 

৬৩. সাহায্য মেলাঃ তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে “চ্যারিটি ফেয়ার”, “চ্যারিটি ফীস্ট” ইত্যাদি নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করুন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌ কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে তাদের সাধ্যমত আর্থিক অনুদান দেয়ার চেষ্টা করবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা নারী বিষয়ক ইসলামিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে পারেন।

 

৬৪. সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানঃ ইসলামিক স্কলার, দা’ঈ, দা’ওয়াহ্‌ সংগঠন, ইসলামিক পত্রিকা, ইসলামিক ওয়েবসাইট, ইসলামিক সিডি-ভিসিডির দোকান ইত্যাদি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজ নিজ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা পদক প্রদান উপলক্ষে সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করুন। অনুষ্ঠানে ইসলামে দা’ওয়াহ্‌র গুরুত্ব তুলে ধরে উপস্থিত সাধারনের জন্য বক্তব্যের ব্যবস্থা রাখুন। এতে করে সাধারন মানুষ দা’ওয়াহ্‌র গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হবে।

 

৬৫. দা’ওয়াহ্‌ নির্দেশিকাঃ দেশে বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে দা’ওয়াহ্‌ গাইড বা ট্যুরিষ্ট গাইড প্রকাশ করুন। এই গাইডে যেসব বিষয় স্থান পেতে পারে তা হল বিভিন্ন জায়গার ইসলামিক সংগঠন বা দা’ওয়াহ্‌ সংগঠনের ঠিকানা, ইসলামিক গ্রন্থাগার, স্টুডিও, বিখ্যাত মসজিদ, ইসলামিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকেশন, বর্তমানে অনুষ্ঠিতব্য দা’ওয়াহ্‌ কনফারেন্স এর সময়সূচী, স্থানীয় ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের ঠিকানা ইত্যাদি।

 

৬৬. ইসলামিক প্রদর্শনীঃ সংস্কৃতি ও পর্যটন বিভাগের সহায়তায় বড় বড় ইসলামিক বুকস্টল এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনকে নিয়ে ইসলামিক প্রদর্শনীর আয়োজন করুন। এমন প্রদর্শনীতে ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌ কার্যক্রমের সাথে সমমনা স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন কোম্পানির স্টল থাকবে যেখানে তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর এমন কিছু তুলে ধরবে যা ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌র প্রচার-প্রসারে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।

 

৬৭. দা’ওয়াহ্‌ ওয়েবসাইটঃ দা’ওয়াহ্‌ কার্যক্রম চালানোর জন্য সব রকম চাহিদা মেটাতে পারে এমন দা’ওয়াহ্‌ ওয়েবসাইট নির্মাণ করুন। এই ধরনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সবরকম দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ সরবরাহ করা হবে। ফলে ওয়েবসাইটগুলো ইসলামিক বিশেষজ্ঞ বোর্ড এর ন্যায় ভুমিকা পালন করবে। এখানে দা’ওয়াহ্‌ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলোচনাও স্থান পাবে। দা’ওয়াহ্‌ বিষয়ক প্রশ্নোত্তর সেকশনও থাকবে।

 

৬৮. ইফ্‌তার পার্টি আয়োজনঃ দা’ওয়াহ্‌ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রমজান মাসে ইফ্‌তার পার্টির আয়োজন করুন এবং অন্যান্যদের ইফ্‌তার পার্টিতে অংশগ্রহণ করুন। ইফ্‌তার অনুষ্ঠানে সাওম বা রোজার অসাধারণ উপকারিতা এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য এর তাৎপর্য তুলে ধরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিন। অথবা সপ্তাহের যে কোন দুটি দিনকে নির্ধারণ করে ঐ দিনগুলোতে অন্যান্য যারা দা’ওয়াহ্‌র কাজ করছে তাদের সাথে মিলিত হয়ে পারস্পারিক মতবিনিময়ের অয়োজন করুন। এ কাজটি সারা বছর ধরেই চালিয়ে যান।

 

৬৯. হজ্ব এবং ‘উমরাঃ হজ্ব অথবা উমরা করতে যাচ্ছেন এমন মানুষদের এবং বিশেষ করে নতুন মুসলিমদের হজ্ব সফর সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে যথা সম্ভব সহায়তা করুন। ইসলামের দা’ওয়াহ্‌র কাজে

তাদের স্পৃহাকে উজ্জীবিত রাখার উদ্দেশ্যে হজ্বের পূর্বে, হজ্ব পালনের সময় এবং হজ্ব পরবর্তী কি ধরনের ভুমিকা তাদের হওয়া উচিৎ তা তুলে ধরে হজ্ব গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করুন।

 

৭০. যাতায়াত যানবাহনঃ অনেকেই দূরবর্তী কোন ইসলামিক অনুষ্ঠান, অথবা কোন দা’ওয়াহ্‌ অফিসের কোন কোর্সে যোগদানের জন্য যেতে চান কিন্তু যাতায়াত সুবিধা না থাকায় যেতে পারেন না। এক্ষেত্রে আপনি ইসলামের স্বার্থে নিজের গাড়ীতে করে এবং একটু সময় খরচ করে এমন লোকজনকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিন।

 

৭১. দা’ওয়াহ্‌ বিপণীঃ বিভিন্ন জায়গায় দা’ওয়াহ্‌ বিপণী স্থাপন করুন। এই বিপণীগুলো বিভিন্ন দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ সংগ্রহের কাজ করবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ দা’ওয়াহ্‌ উপকরণ হিসেবে ইসলামিক বই-পুস্তক, সিডি-ভিসিডি’র কপি ইত্যাদি দিতে চাইলে সেগুলো গ্রহন করবে। সংগৃহীত দা’ওয়াহ্‌ উপকরণগুলো নামমাত্র দামে মসজিদ-মাদ্রসা এবং স্কুল-কলেজগুলোতে সরবরাহ করতে হবে।

 

৭২. দা’ওয়াহ্‌ কার্যালয়ঃ স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দা’ওয়াহ্‌ কার্যালয় স্থাপন করুন। অন্যান্যদেরও কার্যালয়গুলোতে নিয়ে যান। কার্যালয়গুলোর বিভিন্ন প্রোগ্রামে শরিক হউন। যারা সেখানে ইসলামের দা’ওয়াহ্‌র কাজে নিয়োজিত আছেন তাদের সহায়তা করুন, উৎসাহ দিন।

 

৭৩. মানুষের জন্য দো’য়া করুনঃ মানুষকে ইসলামের পথে ডাকার অংশ হিসেবে তাদের জন্য বিভিন্ন সময়ে দো’য়া করুন। যেমনঃ হয়ত কাউকে কোন হারাম কাজে লিপ্ত হতে দেখলে তাকে বলুন, “আল্লাহ্‌ আপনাকে জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাজত করুন।” অথবা কেউ কোন ভাল কাজ করলে তার জন্য বলুন, আল্লাহ্‌র কাছে দো’য়া করি তিনি যেন আমাদের সবাইকে জান্নাতে তাঁর রাসূলের (সা) কাছাকাছি রাখেন।” অথবা কোন ছাত্রের জন্য দো’য়া করলে বলুন, “আল্লাহ্‌ আপনাকে ইহকাল এবং পরকালের উভয় পরীক্ষায় সাফল্য দান করুন।”

 

৭৪. ব্যক্তিগত সাক্ষাৎঃ সালাত আদায়ের ব্যপারে উদাসীন বা একবারেই সালাত আদায় করে না এমন লোকদের সাথে সরাসরি দেখা করুন। আযানের সময় হয়ে এসেছে এমন সময় তাদের সাথে দেখা করুন যাতে করে তাদেরকে সাথে নিয়ে মসজিদে যেতে পারেন।

 

৭৫. ইসলাম গ্রহণের ঘোষণাঃ সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমদের জুম’আর মসজিদে নিয়ে আসুন। সালাত শেষে তাদের মুখ থেকেই শুনুন কিভাবে বা কেন তারা ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল। ইসলামের কোন কোন দিক তাদেরকে বেশী আকর্ষণ করেছে। তাদের কাছ থেকে শোনার পর উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে দা’ওয়াহ্‌র বিভিন্ন উপায় তুলে ধরে কিছু বলুন যা তাদের কাজে আসবে। ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি কোন মহিলা হলে তাকে কোন গার্লস স্কুল বা কোন মহিলা সংস্থায় নিয়ে যান এবং সেখানে তার ম্নুখ থেকে ইসলাম গ্রহণের কাহিনী শুনুন । এতে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে।

 

৭৬. সাধারণ যানবাহনঃ আকর্ষণীয় এবং প্রাসঙ্গিক পোস্টার, স্টিকার, অডিও সিডি/ডিভিডি ইত্যাদি ছাপিয়ে এবং তৈরি করে বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট যানবাহনের মালিক সমিতির কাছে সরবরাহ করুন। এগুলো তারা তাদের বাস, প্রাইভেট কার, মোটর বা ট্যাক্সি ক্যাব ইত্যাদিতে ব্যবহার করবে। মাঝে মাঝে ইসলামিক দা’ওয়াহ্‌র কাজে সহযোগিতার জন্য তাদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করুন।

 

৭৭. দা’ওয়াহ্‌ বুথঃ শহরের বড় বড় শপিং মল, সুপার মার্কেট এলাকা, নিউমার্কেট এলাকা ইত্যাদি যে স্থানগুলোতে প্রচুর জনসমাগম হয় এমন স্থানগুলোতে দা’ওয়াহ্‌ বুথ স্থাপন করুন। এই দা’ওয়াহ্‌ বুথ বা দা’ওয়াহ্‌ স্টলগুলোর টেবিলে দা’ওয়াহ্‌ বিষয়ক ক্লিপ্স দেখানোর জন্য রাখতে হবে বড় পর্দার টেলিভিশন। সাথে থাকবে নজরকাড়া প্রচ্ছদের সব দা’ওয়াহ্‌ সংশ্লিষ্ট ইসলামিক বই-পুস্তক, দা’ওয়াহ্‌ পত্রিকা, অডিও ক্যাসেট, ভিডিও, সিডি, ভিসিডি ইত্যাদির অনন্য সমাহার যা উপস্থিত দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হবে।

 

৭৮. টেলিফোন দা’ওয়াহঃ আপনার মোবাইল বা টেলিফোনের ওয়েলকাম টিউন হিসেবে বিভিন্ন দা’ওয়াহ্‌ মেসেজ ব্যবহার করুন। কোন কলার আপনাকে কল করলে তিনি তা শুনতে পাবেন। ফোনকলটি রিসিভ না করা পর্যন্ত কলার মেসেজটি শুনতে থাকবেন। ওয়েলকাম টিউনটি হতে পারে, “সম্মানিত কলার, আপনি আজকে সালাত আদায় করেছেন তো? কারণ সালাতই হল একজন কাফির ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্যকারী বিষয়।” এছাড়া মোবাইল এবং টেলিফোনের মাধ্যমে দাওয়াহ্‌ সেন্টার থেকে লোকজন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে পারেন।

 

৭৯. আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্সঃ আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করুন। এই কোর্সগুলো কথোপকথনমূলক (কনভারসেশনাল) আরবি ভাষা এবং আরবি ব্যকরনের উপর গুরুত্ব দিতে পারে। এক্ষেত্রে আরবি ব্যকরনের জ্ঞান কোরআন বুঝে পড়তে সাহায্য করবে। সরাসরি কোর্সের বদলে ধারণকৃত ক্লাস লেকচার প্রোজেক্টরে দেখানোর মাধ্যমেও আরবি ভাষা শেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কাজটি নিজের বাড়ী কিংবা কর্মক্ষেত্রে যেখানে সুবিধা করা যেতে পারে।

 

৮০. ইসলামিক কোর্সঃ তাওহীদ, শির্‌ক, বিদ্‌য়া’হ্‌, হালাল-হারাম, ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য, ইসলামে দাম্পত্য জীবন, ইসলামে নারী অধিকার, বিয়ে অনুষ্ঠানের ‘আদব ইত্যাদিসহ আকীদাহ্‌গত বিভিন্ন বিষয়ের উপর ইসলামিক কোর্সের আয়োজন করুন। কোর্সগুলো স্থানীয় মসজিদ বা দা’ওয়াহ্‌ সংগঠনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এছাড়া যারা ইসলামের দা’ঈ হিসেবে কাজ করতে চাই তাদের জন্য দা’ওয়াহ্‌ ট্রেনিং কোর্সের আয়োজন করুন।

 

৮১. দা’ওয়াহ্‌ দিবসঃ উন্মুক্ত দা’ওয়াহ্‌ দিবসের আয়োজন করুন এবং এতে বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখুন। অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষ, দেশী-বিদেশী সকলশ্রেণীর মানুষদের জন্য সুব্যবস্থা রাখুন। দা’ওয়াহ্‌ দিবস অনুষ্ঠানের একমাস আগে থেকেই স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ সকল জায়গায় মৌখিক ঘোষণা এবং পোস্টারের মাধ্যমে প্রচারনা চালিয়ে তা সকলকে জানিয়ে দিন যাতে করে দা’ওয়াহ্‌ দিবসের আয়োজন মানুষের মুখে মুখে প্রচার লাভ করে।

 

পরিশেষে, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে আমরা এই দো’য়া করি তিনি যেন আমাদের প্রত্যেককে তাঁর দ্বীনের দা’ঈ হিসেবে কবুল করে নেন এবং তাঁর জান্নাতে আমাদেরকে সেই সমস্ত সৎকর্মশীলদের পাশে স্থান দেন যারা তাঁর দ্বীনকে সঠিকভাবে পালন করে গেছেন।

English Version

আল্লাহর পথে দাওয়াত - পর্ব ১  | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪

 

উৎস:http://www.quraneralo.com/more-than-eighty-ways-to-make-dawah/

বিষয়শ্রেণী: আখলাক | ব্যক্তিত্ব

লেখক: মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ

যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ, সে-ই প্রকৃত মুসলিম৷ আর যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে, সে-ই প্রকৃত হিজরতকারী৷ হাদীসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন৷


ইমাম মুসলিম এর প্রথম অংশ বর্ণনা করেছেন৷

অর্থাৎ একজন মুসলিম তার কথা কিংবা কাজের দ্বারা অপর মুসলিমকে কষ্ট দেয় না৷ যে নিন্দা করা, গালমন্দ করা, দোষ বর্ণনা করা, অপবাদ দেয়া, আক্রমণ করা কিংবা উপহাস করার মাধ্যমে মানুষকে কষ্ট দেয়, তার জিহ্বা থেকে মানুষ নিরাপদ নয়৷ তেমনি যে কাউকে আঘাত করা, হত্যা করা, কারও সম্পদ হরণ করা ইত্যাদির মাধ্যমে কাউকে কষ্ট দেয়, তার হাত থেকে মানুষ নিরাপদ নয়৷ অবশ্য জিহ্বা বা হাতের দ্বারা কষ্ট দেয়ার বিষয়টি আরও ব্যাপক হতে পারে, যেমন কাউকে জিহ্বা কিংবা হাতের অঙ্গভঙ্গির দ্বারা কষ্ট দেয়া৷ আবার কখনও মানুষ পরোক্ষভাবে অন্যের কষ্টের কারণ হয় - তারাও এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে৷ যেমন কোন মজলিসে কেউ একজন ব্যক্তিকে উল্লেখ করে যেন অন্যরা তার দোষ আলোচনা করতে পারে৷ কেউ লোক ভাড়া করে কাউকে হত্যা করায়, কারও জমি দখল করে নেয়, কারও সম্পদের ক্ষতি করে ইত্যাদি৷

এই হাদীসে মানুষকে কষ্ট না দেয়ার বৈশিষ্ট্যকে সরাসরি ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে: এই বৈশিষ্ট্য যার নেই, তার যেন ইসলামই নেই! যদিও এখানে ইসলাম সম্পূর্ণ না থাকা উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য ইসলামের পূর্ণতা না থাকা তথা ঘাটতি থাকা৷ অর্থাৎ ইসলামের অন্যান্য বিধান পালনের পাশাপাশি যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ হবে, তার ইসলাম পরিপূর্ণ হবে, নতুবা তার ইসলামে অপূর্ণতা থেকে যাবে৷ এজন্য হাদীসের কোন কোন ভাষ্যে এসেছে, নবীকে প্রশ্ন করা হল:
أَيُّ الْإِسْلَامِ أَفْضَلُ

কোন ইসলাম সর্বোত্তম?

অথবা
أَىُّ الْمُسْلِمِينَ خَيْرٌ

মুসলিমদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? এর জবাবে তিনি এই কথাটি বলেছিলেন৷

এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে একজন মুসলিমের জান, মাল ও সম্মান অলংঘনীয়। এজন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে বলেছিলেন:
إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ بَيْنَكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا

 নিশ্চয়ই তোমাদের পরস্পরের জান, মাল ও সম্মান ঠিক তেমনি অলংঘনীয় যেমনিভাবে তোমাদের এই নগরীতে [অর্থাৎ মক্কা নগরী] এই মাসের এই দিনটি [অর্থাৎ যিলহজ্জের ১০ তারিখ] পবিত্র৷১
 

অপর হাদীসে তিনি বলেন:
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ

প্রত্যেক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের জীবন, সম্পদ ও সম্মান অলংঘনীয়৷২
 

আজ মুসলিমদের মধ্যে সালাত, সাওম, যাকাত, হজ্জ্ব জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো পালনের গুরুত্ব যতটা আলোচিত ও উপলুব্ধ হয়; মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার গুরুত্ব ততটা আলোচিত কিংবা উপলুব্ধ হয় না৷ এজন্য মানুষ অপরের গীবত বা পরচর্চা, অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করে কার্টুন আঁকা, পত্র-পত্রিকায় কিংবা বক্তৃতার মঞ্চে কাউকে প্রকাশ্যে নিন্দা, গালমন্দ করা - এগুলোকে কোন অপরাধই মনে করে না। অন্যের জান-মাল হরণ করে, অন্যের ক্ষতি করেও একজন মানুষ নামায-রোযা-হজ্জ্ব পালন করে তসবী হাতে নিয়ে সমাজে ভাল মানুষ সাজতে পারে৷ ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে, জনগণের সম্পদ হরণ কিংবা ধ্বংস করেও মানুষ ভাল মুসলিম থাকতে পারে!

উপরোক্ত হাদীসটি তাই আমাদের অনেকের জন্যই ইসলামের মহান শিক্ষার এক নতুন দুয়ার ও অদেখা দিগন্তকে খুলে দেয়৷ ইসলামের শিক্ষা ব্যাপক, আর এর ব্যাপক শিক্ষার একটা বড় দিক জুড়ে রয়েছে মানুষের অধিকার, তাদের জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার বিষয়টি৷ এর সাথে সংশ্লিষ্ট বহু আয়াত ও হাদীস মানুষকে কষ্ট দেয়ার ফলে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তি ও পরিণতি বর্ণনা করেছে এবং যারা তা থেকে বিরত থাকে, তাদের প্রতিদান বর্ণনা করেছে৷

কারও দোষত্রুটি তালাশ করা, আক্রমণ করা, গালমন্দ করা, কিংবা আঘাত করা, নির্যাতন করা, সম্পদ হরণ করা থেকে যারা সতর্ক - এটি তাদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতার প্রমাণ৷ যারা আল্লাহর ভয়ে মানুষকে তাদের জিহ্বা ও হাতের আঘাত থেকে রেহাই দেয়, তারা ইসলামের অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোও যথাযথভাবে পালন করবে - এটাই অধিক সম্ভাব্য৷ এর বিপরীতে, ইসলামের বাহ্যিক অনুষ্ঠানগুলো পালন করাই অন্তরের পরিচ্ছন্নতার প্রমাণ নয়৷

এই হাদীসটিতে আরও রয়েছে প্রকৃত হিজরতের পরিচয়৷ হিজরত বলতে সাধারণভাবে আল্লাহর রাস্তায় দেশত্যাগ করাকে বোঝায়৷ অর্থাৎ হিজরত হল দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য অবিশ্বাসীদের ভূমি ত্যাগ করে মুসলিমদের ভূমিতে বসতি-স্থাপন৷ যে হিজরত করে, তাকে মুহাজির বলা হয়৷ এই হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নতুন এক প্রকার হিজরতের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যা আরও ব্যাপক - যা প্রতিনিয়ত সকলকেই করতে হয় - আর তা হল আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে ত্যাগ করা৷ যে আল্লাহর অবাধ্যতাকে ত্যাগ করে তাঁর আনুগত্যের গণ্ডীতে প্রবেশ করে - সে-ই প্রকৃত মুহাজির৷ পাপ পরিত্যাগ করা হল সেই হিজরত যা সবাই সবসময় করতে পারে, বরং তা করতে তারা আদিষ্ট৷

এই হাদীস থেকে আমরা যে শিক্ষাগুলো পাই তা সংক্ষেপে এই:
১. ইসলাম ও ঈমানের স্তরের তারতম্য হয়৷ কারও ইসলাম পূর্ণ, কারও অপূর্ণ৷ কারও ইসলাম অপরের থেকে উত্তম৷
২. ভাল কাজের তারতম্য অনুসারে ইসলামের স্তরের তারতম্য হয়৷
৩. ইসলাম শুধু বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসলামের শিক্ষা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেনের গভীরতম বিষয়গুলোকে স্পর্শ করেছে৷
৪. কথা কিংবা কাজের দ্বারা মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা ইসলামের একটি অন্যতম শিক্ষা৷ যার মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য নেই, তার ইসলাম অপূর্ণ৷
৫. কথার ব্যাপারে খুব সতর্ক ও সচেতন হওয়া উচিৎ৷
৬. পাপকাজ পরিত্যাগ করাই প্রকৃত হিজরত৷
৭. দ্বীনের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে যথার্থভাবে আদায়ের চেষ্টার পাশাপাশি অন্তরের অবস্থার দিকেও আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিৎ৷
 

১বুখারী, মুসলিম৷
২মুসলিম৷

উৎস:http://www.oiep.net/post/7

বিষয়শ্রেণী: কোরআন

লেখক: মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

মুসলিম হিসেবে দুনিয়া এবং আখিরাতে আমাদের সাফল্য, সম্মান ও মর্যাদা মাত্র একটি পথেই আসতে পারে - আর তা আল কুরআনকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ أَنزَلْنَآ إِلَيْكُمْ كِتَبًۭا فِيهِ ذِكْرُكُمْ ۖ أَفَلَا تَعْقِلُونَ ‎

নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি এক কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তোমাদের জন্য উপদেশ ও মর্যাদা রয়েছে, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?১

অর্থাৎ তোমাদের প্রতি আমি যে কিতাব নাযিল করেছি, সেই আল-কুরআনের অধ্যয়ন, এর শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তোমরা দুনিয়া ও আখিরাতে কাঙ্খিত মর্যাদা ও সাফল্য লাভ করতে পারবে। তবুও কি তোমরা বুঝবে না যে তোমাদেরকে অন্যদের ওপর কী শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে?

এই আয়াতে মর্যাদা বোঝানোর জন্য যিকর শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত চমৎকার, কেননা এর অপর অর্থ হল উপদেশ৷ সুতরাং আল কুরআনে রয়েছে এই উম্মাতের যিকর, এর দ্বারা একই বাক্যে ফলাফল ও কারণ – দুটিকেই অত্যন্ত চমৎকারভাবে নিয়ে আসা হয়েছে; যেন বলা হচ্ছে: যদি তোমরা আল-কুরআনের উপদেশ গ্রহণ কর, তবে তোমরা তোমাদের কাঙ্খিত সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করতে পারবে৷

আল কুরআন মানুষের নিকট স্বয়ং তার স্রষ্টার বার্তা৷ কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কারও কাছে কোন চিঠি বা বার্তা পাঠালে তা পড়ে, জেনে, বুঝে সে অনুযায়ী কাজ না করে সে কখনোই স্বস্তি পাবে না - যদি সত্যিই প্রেরক তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়৷ সেক্ষেত্রে স্বয়ং স্রষ্টার পাঠানো বার্তা না পড়ে, না জেনে, বাস্তবায়ন না করে একে গিলাফে বন্দী করে তাকে উঠিয়ে রেখে কিভাবে একজন মুসলিম স্বস্তি পেতে পারে?

আমরা আজ আল কুরআন থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছি৷ যারা আল কুরআনের সাথে সামান্য কিছু সম্পর্ক রেখেছেন, তারা তা রেখেছেন শুধুমাত্র একে তিলাওয়াত বা পাঠ করার মাধ্যমে৷ আল-কুরআন বিশুদ্ধভাবে পাঠ করতে পারা লোকের সংখ্যাই কম, আর একে জেনে-বুঝে আমলে বাস্তবায়ন করা লোকের সংখ্যা তো নিতান্তই নগণ্য৷

এই যদি আমাদের অবস্থা হয়, তবে কিয়ামতের দিন আমাদের জন্য এক লজ্জাজনক দৃশ্য অপেক্ষা করছে। যেদিন স্বয়ং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ পেশ করে বলবেন:
وَقَالَ ٱلرَّسُولُ يَرَبِّ إِنَّ قَوْمِى ٱتَّخَذُوا۟ هَذَا ٱلْقُرْءَانَ مَهْجُورًۭا

আর রাসূল বলবে, হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছে৷২

যে লোকগুলো আল্লাহকে, তাঁর রাসূলকে ভালবাসা ও তাঁদের প্রতি ঈমানের দাবী করছে, স্বয়ং সেই লোকগুলোর বিরুদ্ধেই হয়ত অভিযোগ আনা হবে: তারা আল-কুরআনকে অধ্যয়ন করে নি, আল-কুরআনের অর্থ শেখেনি, একে জীবনে বাস্তবায়ন করে নি - সর্বোপরি তারা আল কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে৷

তাই এখনই সময় আল-কুরআনের দিকে ফিরে আসার৷ আল-কুরআনের দিকে ফিরে আসতে হলে আমাদেরকে সাধ্যমত কয়েকটি কাজ করতে হবে:

১) নিয়মিত আল কুরআনের তিলাওয়াত৷
২) সাধ্যমত একে মুখস্থ করা৷
৩) নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা শেখা৷
৪) আল-কুরআনের অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা, যাকে আল কুরআনে তাদাব্বুর বলা হয়েছে৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:
كِتَبٌ أَنزَلْنَهُ إِلَيْكَ مُبَرَكٌۭ لِّيَدَّبَّرُوٓا۟ ءَايَتِهِۦ وَلِيَتَذَكَّرَ أُو۟لُوا۟ ٱلْأَلْبَبِ

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে৷৩

৫) আল কুরআনের শিক্ষাকে আমলে বাস্তবায়ন
৬) মানুষকে আল কুরআন শেখানো এবং আল কুরআনের দিকে আহ্বান জানানো৷
এই সমস্ত কাজগুলো করার মাধ্যমে আমরা যদি আবারো আল-কুরআনের দিকে ফিরে আসতে পারি, তবে আমরা সর্বোত্তম মানুষ হতে পারব বলে আশা করা যায়, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই যারা নিজেরা কুরআন শেখে ও অপরকে তা শেখায়!৪

 

১ সূরা আল আম্বিয়া, ২১ : ১০৷
২ সূরা আল ফুরকান, ২৫ : ৩০৷
৩ সূরা সাদ, ৩৮ : ২৯৷
৪ বুখারী৷

 

উৎস:http://www.oiep.net/post/5

বিষয়শ্রেণী: ইবাদত

লেখক: মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

আনাস রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

 তোমাদের কেউ ততক্ষণ পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার পুত্র এবং সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হই৷
 

হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম নিজ নিজ হাদীস সংকলনে বর্ণনা করেছেন৷ মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত এক ভাষ্যে এসেছে:
لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

বান্দা ততক্ষণ পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পরিবার, তার সম্পদ এবং সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হই৷

এই হাদীস থেকে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জানতে পারি, তা হল নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসা ঈমানের দাবী৷ শুধু তাই নয়, তাঁকে সকল বস্তু ও ব্যক্তি অপেক্ষা বেশি ভালবাসার দ্বারাই ঈমান পূর্ণতা পেতে পারে৷

মানুষ সহজাতভাবেই অন্যকে ভালবাসে৷ সে প্রবৃত্তিগতভাবেই সম্পদ ভালবাসে৷ সে তার মাতাপিতাকে ভালবাসে, এই ভালবাসা ভক্তি ও সম্মানের ভালবাসা৷ সন্তানের প্রতি স্নেহ, মমতা ও দয়ার কারণে সে সন্তানকে ভালবাসে৷ সামাজিক বন্ধন, সম্প্রীতি ও সাদৃশ্যের কারণে সমাজের মানুষ একে অপরকে ভালবাসে৷ তেমনি মানুষ সহজাতভাবেই তার স্বামী কিংবা স্ত্রীকে ভালবাসে৷ উপরের হাদীস আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে যে, যদি আমরা মুমিন হওয়ার দাবী করি, তবে এই সব ধরনের ভালবাসার ওপর আল্লাহর রাসূলের ভালবাসাকে প্রাধান্য দিতে হবে৷ এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও তাঁকে বেশি ভালবাসা কর্তব্য৷ হাদীসে বর্ণিত, একবার উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন:
يَا رَسُولَ اللَّهِ لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مِنْ نَفْسِي

হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয়ই আপনি আমার নিকট আমার জীবন ছাড়া আর সকল কিছু থেকে বেশি প্রিয়৷

এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
لَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ

না, যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ যতক্ষণ না আমি তোমার জীবনের চেয়ে তোমার কাছে বেশি প্রিয় না হই [ততক্ষণ তুমি পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না]৷
 

ফলে উমার তাঁকে বললেন:
فَإِنَّهُ الْآنَ وَاللَّهِ لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي

তাহলে এখন, আল্লাহর শপথ, আপনি আমার নিজের জীবনের চেয়েও আমার কাছে বেশি প্রিয়৷
 

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:

الْآنَ يَا عُمَرُ

এখন হে উমার [তুমি পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হয়েছ]৷ হাদীসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন৷
 

নবীকে সকল বস্তু ও ব্যক্তির চেয়ে বেশি ভালবাসার কারণ কি? আর এই ভালবাসার স্বরূপ ও দাবীই বা কি?

মানুষ মাত্রই নিজের কল্যাণ চায়, অকল্যাণ থেকে বাঁচতে চায়৷ সকল দুঃখ-কষ্ট-গ্লানি-ক্লেশ থেকে মুক্ত ও সকল কাম্য বস্তুতে পরিপূর্ণ অনন্ত-জীবন সকলেরই কাম্য৷ আর তাই যে তাকে অনাকাঙ্খিত বস্তুর কোনটি থেকে রক্ষা করে কিংবা তার কাম্য কোনকিছু তাকে উপহার দেয়, তাকে সে ভালবাসে৷ এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যৌক্তিকভাবেই আমাদের উচিৎ সকল মানুষের মধ্যে নবীজীকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসা, কারণ তাঁর হাতেই আমরা হেদায়েত পেয়েছি, জাহেলিয়াতের আঁধার থেকে বের হয়ে ইসলামের প্রশস্ত আলোকিত রাজপথে চলার সুযোগ পেয়েছি, সত্য-মিথ্যাকে জানতে পেরেছি৷ তিনি আমাদেরকে জাহান্নামের দুর্বিসহ শাস্তি থেকে বেঁচে জান্নাতের অনন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভের পথ দেখিয়েছেন৷ শুধু তাই নয়, দুনিয়ার জীবনেও সুখ-শান্তি ও আত্মতুষ্টির চাবিকাঠি রয়েছে এই নবীর সুন্নাতের অনুসরণের মধ্যেই৷ এক কথায় আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে ইসলামে, আর এই ইসলাম আমরা যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে পেয়েছি, তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷ তিনি উম্মাতের কল্যাণের জন্য নিজের বিশ্রামকে বিসর্জন দিয়েছেন৷ নিজের জীবন ও সম্পদকে বিলিয়েছেন উম্মাতের হেদায়েতের জন্য৷ তাই আমাদের মা-বাবা, সন্তান, স্বামী বা স্ত্রী কিংবা অন্য যে কোন মানুষের চেয়ে আমাদের জীবনে তাঁর ইহসান, তাঁর অবদান অনেক গুণ বেশি৷ আর তাই তাঁকেই আমরা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালবাসি৷

নবীকে ভালবাসার স্বরূপ ও দাবী কি? শুধু মুখে তাঁকে ভালবাসার শ্লোগান দেয়াই কি যথেষ্ট?

আজ অনেকেই নবীর প্রতি ভালবাসা প্রকাশের নামে তাঁর জন্মদিন উদ্‌যাপন, মিলাদুন্নবী পালন, এ উপলক্ষে মিছিল সহ এমন সব অনুষ্ঠান করছে, যা ইসলামের সমর্থিত নয়, যার ব্যাপারে স্বয়ং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন৷ এগুলো দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিষয় বা বিদাত, যার ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ

 যে আমাদের এই দীনের মধ্যে এমন কোন কিছু উদ্ভাবন করবে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে৷

হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম নিজ নিজ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন৷

নবীকে ভালবাসার প্রমাণ হল: তাঁর অনুসরণ করা, তাঁর আদেশগুলো মেনে চলা, তিনি যা কিছু নিষেধ করেছেন তা পরিত্যাগ করা, তিনি যা কিছু সংবাদ দিয়েছেন তার প্রতি ঈমান রাখা এবং একমাত্র তাঁর প্রদর্শিত পদ্ধতিতেই আল্লাহর ইবাদত করা৷

তাঁকে ভালবাসার দাবী হল তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা, তাঁর সুন্নাত প্রতিষ্ঠার জন্য সাধনা করা৷ 

তাঁকে ভালবাসার দাবী হল সকলের বক্তব্যের ওপর তাঁর বক্তব্যকে প্রাধান্য দেয়া, সকলের আদর্শের ওপর তাঁর আদর্শকে প্রাধান্য দেয়া, সকলের আনুগত্যের ওপর তাঁর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়া৷

তাঁকে ভালবাসার দাবী হল তাঁর সুন্নাতকে সমুন্নত করা, তাঁর সুন্নাতের পক্ষ নেয়া, তাঁর আনীত শরীয়তকে প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করা৷

যদি এগুলো করা না হয়, তবে তাঁকে ভালবাসার দাবী মিথ্যা!

আমরা উপরের কাজগুলোর সাথে নিজেদের জীবনকে মিলিয়ে নিলে সহজেই বুঝতে পারব, আমরা সত্যিই নবীকে কতটুকু ভালবাসি৷ আর এই ভালবাসার পরিমাণ আমাদেরকে জানিয়ে দেবে - আমাদের ঈমান কতটুকু দৃঢ়৷

উৎস:http://www.oiep.net/post/4

বিষয়শ্রেণী: ঈমান

লেখক: মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

ঈমান হল বিশ্বাস, কথা ও কাজের সমন্বয়৷ তাই মুমিন হতে হলে অন্তরে বিশ্বাস বা স্বীকৃতি থাকতে হবে যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদত পাওয়ার যোগ্য কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল৷ সেই সাথে মুখে এই ঘোষণা বা সাক্ষ্য দিতে হবে৷ এরপর এই সাক্ষ্য অনুযায়ী আমল করতে হবেঃ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে হবে এবং ইবাদতে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না৷ সুতরাং এই তিনটি বিষয় মিলেই ঈমান:
১) অন্তরের স্বীকৃতি৷
২) মৌখিক ঘোষণা৷
৩) আমল৷


মানুষের মুখে প্রচলিত ভাষায় ঈমানকে বিশ্বাস হিসেবে অনুবাদ করা হয়৷ এজন্য অনেকের ধারণা এই যে আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করাই ঈমান৷ কেউ মনে করেন যে আল্লাহকে এক বলে জানাই ঈমান৷ কিন্তু শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান আরও ব্যাপক, শুধু বিশ্বাস বা জ্ঞানকে ঈমান বলা যায় না৷ শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকারকারী আস্তিককে মুমিন বলা যাবে না৷ তেমনি কেবল ইসলাম ধর্মের সত্যতা কিংবা কুরআন বা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর সত্যতা জানাই ঈমান নয়৷ বরং ঈমান এর চেয়েও বেশি কিছু৷ ব্যক্তি যখন এই বিশ্বাস বা জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত হয়ে দুটি সাক্ষ্য দেয় এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে আর তদানুযায়ী আমল করে, তখনই সে মুমিন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে৷ যদি শুধু বিশ্বাস ও জ্ঞানই ঈমান হত, তবে স্বয়ং ইবলীসও মুমিন হয়ে যেত! বিতাড়িত ইবলীস ভাল করেই জানে যে আল্লাহ তাআলাই একমাত্র প্রকৃত মাবুদ, সে ভাল করেই জানে যে মুহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল৷ তা সত্ত্বেও সে তার দম্ভ ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে স্থায়ীভাবে বিতাড়িত হয়েছে৷

 

আবার অনেকের ধারণা এই যে শুধু মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ - এই ঘোষণা দেয়াই ঈমান৷ এ ধারণাও সঠিক নয়, কেননা মুনাফিকরাও এই ঘোষণা দিত৷ শুধু তাই নয়, তারা মুসলিমদের সাথে সালাতও আদায় করত, কিন্তু তাদের অন্তরে তারা লালন করত কুফরী ও ইসলামের প্রতি শত্রুতা৷ আল-কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই মুনাফিকদের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে মুসলিমদেরকে সতর্ক করেছেন এবং জানিয়েছেন যে এরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে৷ তাই শুধু মৌখিক ঘোষণা কাউকে ঈমানদার করে না৷


ঈমান হল অন্তরের স্বীকৃতি, মৌখিক ঘোষণা এবং আমলের সমষ্টি৷ এজন্য আল কুরআনে সাফল্য ও জান্নাত লাভের শর্ত হিসেবে বারবার ঈমানের সাথে আমলে সালিহকে জুড়ে দেয়া হয়েছে৷ কেউ যদি মোটেই কোন আমল না করে, দ্বীন পালন না করে, তবে তার অন্তরের বিশ্বাস কিংবা মৌখিক ঘোষণা তার কাজে আসবে না৷

আমল যে ঈমানের অংশ, তার প্রমাণ এই যে কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন আমলকে ঈমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে৷ উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
« الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ »

ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে, এর মাঝে সর্বোত্তম হল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আর এর মাঝে সর্বনিম্ন হল পথ থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরানো, আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা৷১


এই হাদীসে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর ঘোষণাকে ঈমান বলা হয়েছে৷ তেমনি পথ থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরানো - যা একটি বাহ্যিক আমল, তাকেও ঈমানের অংশ বলা হয়েছে৷ আবার লজ্জা - যা অন্তরের একটি আমল, তাকেও ঈমান বলা হয়েছে৷


হাদীসে আরও বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ

 ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না৷২

 

অর্থাৎ যখন সে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন সে পরিপূর্ণ ঈমানদার থাকে না। তার এই পাপ অনুপাতে তার ঈমান মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়৷সালাত প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ

আমাদের ও তাদের [অর্থাৎ মুনাফিকদের] মধ্যে চুক্তি [অর্থাৎ এমন বিষয় যার কারণে তাদেরকে মুসলিম গণ্য করা হচ্ছে ও জান-মালের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে] হল সালাত, যে তা পরিত্যাগ করবে, সে কুফরীতে লিপ্ত হবে৷৩

 

অপর হাদীসে এসেছে:
إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ

নিশ্চয়ই ব্যক্তি এবং শিরক ও কুফরের মাঝে রয়েছে সালাত ছেড়ে দেয়া৷৪

 

এমনিভাবে আরও বহু আমলের সাথে সরাসরি ঈমানের থাকা বা না থাকাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে - যা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে আমল ঈমানেরই একাংশ৷


ঈমানের বাস্তবতার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক আরও একটি বিষয় হচ্ছে ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি৷ যেমনিভাবে ঈমান অন্তরের স্বীকৃতি, কথা ও কাজের সমষ্টি, তেমনি এই স্বীকৃতি বা বিশ্বাসের দৃঢ়তা, ঘোষণার সত্যতা ও আমলের পরিমাণ কিংবা মানের হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে সাথে ঈমানেরও তারতম্য ঘটে৷ সুতরাং সকলের ঈমান সমপর্যায়ের নয়৷ আবু বকর, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা প্রমুখের ঈমান আর একজন সাধারণ মুসলিমের
ঈমানে মধ্যে আছে বিরাট ফারাক৷ তেমনি একই ব্যক্তির ঈমান ভাল কাজের দ্বারা বৃদ্ধি পায়, মন্দ কাজের দ্বারা হ্রাস পায়৷ এছাড়া আল্লাহ তাআলার যিকর, তাঁর প্রতি ভালবাসা, ভয়, আশা, ভরসা ও ভক্তির তারতম্যের কারণে ঈমানের তারতম্য হয়৷ নিয়তের তারতম্যের কারণেও ঈমানের তারতম্য হয়৷ এই বাস্তবতাকে বোঝানোর জন্যই আলেমগণ বলেন:
الإيمان قول وعمل يزيد وينقص

ঈমান হল কথা ও কাজ, তা বাড়ে ও কমে৷


ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি আল-কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ ءَايَتُهُۥ زَادَتْهُمْ إِيمَنًۭا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

প্রকৃত মুমিন তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের অন্তর কেঁপে উঠে, আর তাদের কাছে তাঁর আয়াতগুলো পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা একমাত্র তাদের রবের উপরই তাওয়াক্কুল করে৷৫


এই আয়াতে স্পষ্টত বলা হয়েছে যে কুরআনের আয়াত মুমিনদের ঈমানকে বাড়িয়ে দেয়৷ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
إن الإيمان ليخلق في جوف أحدكم كما يخلق الثوب فاسألوا الله أن يجدد الإيمان في قلوبكم

নিশ্চয়ই তোমাদের কারও অন্তরে ঈমান পোশাক মলিন হয়ে যাওয়ার মত করে পুরোনো হয়ে যায়, সুতরাং আল্লাহর কাছে তোমরা চাও - যেন তিনি তোমাদের ঈমানকে আবার নতুন করে দেন৷৬

 

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ

যার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকবে, সে ঈমানের মিষ্টি স্বাদ আস্বাদন করবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয় হবে, এবং সে কোন ব্যক্তিকে ভালবাসলে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে আর সে কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এমনভাবে অপছন্দ করবে যেমনিভাবে সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে৷৭
« مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الإِيمَانَ »

 যে আল্লাহর জন্য ভালবাসে, আল্লাহর জন্য ঘৃণা করে, আল্লাহর জন্যই দেয় আবার আল্লাহর জন্যই দেয়া থেকে বিরত থাকে, সে তার ঈমানকে পূর্ণ করেছে৷৮

 

এ হাদীসগুলো থেকেও আমরা ঈমানের তারতম্যের বিষয়টির ইঙ্গিত পাই৷


সারকথা হল ঈমানের অর্থ অনেক ব্যাপক৷ অন্তরে বিশ্বাস আছে, কিংবা শাহাদাত পাঠ করে আমরা মুসলিম হয়েছি - এ কথা মনে করে নিশ্চিন্তে বসে থাকার কোন সুযোগ নেই৷ আল্লাহ তাআলার কাছে মুমিন হিসেবে গণ্য হতে হলে আমাদেরকে জেনে-বুঝে ঈমানের ঘোষণা দিতে হবে এবং এর দাবী অনুযায়ী আমল করতে হবে: সালাত আদায় করতে হবে, সাওম পালন করতে হবে, যাকাত দিতে হবে, হাজ্জ করতে হবে৷ তেমনি হত্যা, ব্যভিচার, সুদ, চুরি, মদ্যপান সহ অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজ ছেড়ে দিতে হবে৷ পর্দা করতে হবে, লজ্জাস্থান, দৃষ্টি, জিহবা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাযত করতে হবে৷ তেমনি আল্লাহকে ভালবাসা, ভয় করা, তাঁর সওয়াবের আশা রাখা, তাঁর ওপর ভরসা করা সহ অন্তরের অন্যান্য আমলগুলো করতে হবে৷ এই সবকিছু মিলেই ঈমান৷


আর এগুলোর তারতম্যের কারণে ঈমানের তারতম্য হয়৷ এজন্য আল্লাহর রাসূলের যুগে একদল বেদুইন সদ্য ইসলামে প্রবেশ করেই যখন পরিপূর্ণ ঈমানের দাবী করতে লাগল, তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন:
قَالَتِ ٱلْأَعْرَابُ ءَامَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا۟ وَلَكِن قُولُوٓا۟ أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ ٱلْإِيمَنُ فِى قُلُوبِكُمْ ۖ وَإِن تُطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَلِكُمْ شَيْـًٔا ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌ

বেদুঈনরা বলল, ‘আমরা ঈমান আনলাম৷’ বল, ‘তোমরা ঈমান আননি৷’ বরং তোমরা বল, ‘আমরা আত্মসমর্পণ করলাম৷’ আর এখন পর্যন্ত তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি৷ আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, তাহলে তিনি তোমাদের আমলসমূহের কোন কিছুই হ্রাস করবেন না৷ নিশ্চয় আল্লাহ অধিক ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু৷৯

 

অর্থাৎ তোমাদের ঈমান এখনও পূর্ণতায় পৌঁছেনি, সুতরাং এখনই তোমরা এর দাবী করো না৷ বরং তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করতে থাক, তবে তোমাদের ঈমান পূর্ণতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা যায়, আর তোমরা যে আমলই কর না কেন - তার পূর্ণ প্রতিদান তোমরা আল্লাহর কাছে পাবে৷


নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে, ঈমানের ব্যাপারে নিশ্চিত না থেকে আমাদের কর্তব্য ঈমানকে শেখার, বৃদ্ধি করার ও দৃঢ় করার অবিরাম চেষ্টা করে যাওয়া৷ নিজেকে পরিপূর্ণ মুমিন দাবী না করে আমাদের উচিৎ ঈমানের দাবী অনুযায়ী সাধ্যমত নেক-আমল করার প্রচেষ্টা চালানো৷

 

 
১বুখারী, মুসলিম৷
২বুখারী, মুসলিম৷
৩আহমদ, তিরমিযী ও অন্যান্য৷
৪মুসলিম৷
৫সূরা আল আনফাল, ৮ : ২৷
৬আল-হাকিম৷
৭বুখারী, মুসলিম৷
৮আবু দাউদ ও অন্যান্য৷
৯সূরা আল হুজুরাত, ৪৯ : ১৪৷

উৎস:http://www.oiep.net/post/6

বিষয়শ্রেণী: ঈমান

লেখক: মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

ঈমান একজন ব্যক্তির সবচাইতে অমূল্য সম্পদ৷ যে ঈমান হারাবে, সে দুনিয়াতে নিকৃষ্ট জীবন-যাপন করবে এবং মৃত্যুর পরের জীবনে জাহান্নাম হবে তার স্থায়ী ঠিকানা৷

 

ঈমান ছাড়া মৃত্যুবরণকারীর জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়েছে৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِ ٱلْجَنَّةَ وَمَأْوَىٰهُ ٱلنَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার জন্য অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম৷ আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই৷১

 

অর্থাৎ যে অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর সমকক্ষ কিংবা অনুরূপ গুণের অধিকারী বলে মনে করা অথবা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কোন বস্তু বা ব্যক্তির ইবাদত করার মাধ্যমে শিরকে লিপ্ত হবে, এবং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে - সে ঈমান হারানোর কারণে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে৷ সে কস্মিনকালেও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার স্থায়ী আবাস হবে জাহান্নাম৷

 

এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে আমাদেরকে সর্বাগ্রে ঈমান আনতে হবে, ঈমানকে শিখতে হবে এবং সবকিছু দিয়ে হলেও - এমনকি জীবন দিয়ে হলেও ঈমানকে রক্ষা করতে হবে৷

 

ঈমান দুনিয়া ও আখিরাতে সমস্ত সাফল্যের চাবিকাঠি৷ যে ঈমান সহকারে নেক আমল করবে, তাকে আল কুরআনে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে:
مَنْ عَمِلَ صَلِحًۭا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌۭ فَلَنُحْيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةًۭ طَيِّبَةًۭ ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا۟ يَعْمَلُون

যে মুমিন অবস্থায় উত্তম আমল করবে - পুরুষ হোক বা নারী - আমি তাকে [দুনিয়ায়] উত্তম জীবন দান করব, আর [আখিরাতে] তাদেরকে প্রদান করব তাদের সর্বোত্তম আমলগুলোর প্রতিদান৷২

 

এই আয়াতে নেককার মুমিনদের দুটি পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে:

• উত্তম জীবন৷
• সর্বোত্তম আমলের প্রতিদান৷

 

এই আয়াতে যে উত্তম জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তা মুমিনরা দুনিয়াতেই লাভ করবে৷ এখানে উত্তম জীবনের অর্থ: তুষ্টি, মনের শান্তি, হালাল রিযক এবং আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে আনন্দ লাভ করা - এ সবকিছু মিলেই একজন মুমিনের জীবন এই পৃথিবীতেই সুন্দর হয়ে ওঠে৷ আর আখিরাতে তার পুরস্কার হিসেবে রয়েছে অনন্ত জান্নাত৷

 

যে ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّلِحَتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌۭ فَأُو۟لَٓئِكَ يَدْخُلُونَ ٱلْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًۭا

আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যারাই মুমিন অবস্থায় নেককাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি নাকীর পরিমাণ যুল্মও করা হবে না৷৩

 

নাকীর বলা হয় খেজুরবিচির ওপরের পাতলা আবরণকে৷ অর্থাৎ ঈমান সহকারে নেক আমল করলে তবেই জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আর যারা এ কাজ করবে, তাদের প্রতিশ্রুত প্রতিদান পুরোপুরি দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি সামান্যতম যুল্‌মও করা হবে না৷

 

নেক আমল আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার শর্ত হল ঈমান থাকা৷ কেউ যদি শত-সহস্র ভাল কাজও করে, কিন্তু তার ঈমানই না থাকে, তবে এই সমস্ত নেক আমল আখিরাতে তার কোন কাজে আসবে না৷ ঈমান না থাকলে সালাত, সাওম, হাজ্জ, যাকাত-সাদকা-কুরবানী, সমাজসেবা জাতীয় বড় বড় ভাল কাজ কোনই কাজে আসবে না৷ এজন্য আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে নেক আমলের প্রতিদান পাওয়ার শর্ত হিসেবে বারবার ঈমানকে জুড়ে দিয়েছেন৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّلِحَتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌۭ فَلَا يَخَافُ ظُلْمًۭا وَلَا هَضْمًۭا

এবং যে মুমিন অবস্থায় ভাল কাজ করবে সে কোন যুল্ম বা ক্ষতির আশংকা করবে না৷৪

 

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

وَمَنْ أَرَادَ ٱلْءَاخِرَةَ وَسَعَىٰ لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌۭ فَأُو۟لَٓئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًۭا

আর যে আখিরাত চায় এবং মুমিন অবস্থায় এর জন্য যথাযথভাবে চেষ্টা করে - তাদের চেষ্টা হবে পুরস্কারযোগ্য৷৫

 

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

فَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّلِحَتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌۭ فَلَا كُفْرَانَ لِسَعْيِهِۦ وَإِنَّا لَهُۥ كَتِبُونَ

সুতরাং যে মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করে তার প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করা হবে না৷ আর আমি তো তা লিখে রাখি৷৬

 

এই আয়াতগুলো পাঠে জানা যায় যে আমলে সালিহ বা নেক আমলের দ্বারা উপকৃত হওয়ার শর্ত হল ঈমান থাকা৷

 

ঈমান ছাড়া আমল আল্লাহ কবুল করেন না৷ হাদীসে বর্ণিত, একবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং বললেন:
يَا رَسُولَ اللَّهِ ابْنُ جُدْعَانَ كَانَ فِى الْجَاهِلِيَّةِ يَصِلُ الرَّحِمَ وَيُطْعِمُ الْمِسْكِينَ فَهَلْ ذَاكَ نَافِعُهُ

হে আল্লাহর রাসূল, ইবনু জুদআন তো জাহিলিয়্যাতের যুগে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করত এবং মিসকীনদেরকে খাওয়াতো, তবে কি তা তার উপকারে আসবে?

 

জবাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
« لاَ يَنْفَعُهُ إِنَّهُ لَمْ يَقُلْ يَوْمًا رَبِّ اغْفِرْ لِى خَطِيئَتِى يَوْمَ الدِّينِ ».

সেটা তার কোন কাজে আসবে না৷ কেননা সে একদিনের জন্যও বলেনি: হে আমার রব, প্রতিদান দিবসে আমার গুনাহ আপনি ক্ষমা করুন৷৭

 

অর্থাৎ এই ব্যক্তি আখিরাতে বিশ্বাসী ছিল না, আর তাই ঈমান না থাকায় তাঁর সামাজিক ভাল কাজের প্রতিদান সে আখিরাতে পাবে না৷

 

অবিশ্বাসী বা অমুসলিমদের মধ্যে অনেকেই সমাজসেবা, রোগাক্রান্তদের শুশ্রুষা, বিপদাপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অভাবীদেরকে সাহায্য করা জাতীয় ভাল কাজ করে থাকেন। তারা কি কোনই প্রতিদান পাবেন না?

 

এর জবাব হচ্ছেঃ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের আমলের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেবেন৷ কেননা তারা আল্লাহর জন্য এই কাজগুলো করেনি, জান্নাতের আশায় এগুলো করেনি৷ তারা এগুলো করেছে লোক দেখানোর জন্য, কিংবা নির্বাচনে জেতার জন্য, অথবা বিখ্যাত হওয়ার জন্য নয়তো আত্মতৃপ্তির জন্য৷ ফলে তারা যা আশা করেছে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই তা তাদেরকে দিয়ে দেবেন, তাই আখিরাতে তাদের জন্য কোন প্রতিদান বরাদ্দ নেই৷

 

অবিশ্বাসীর আমল সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:
وَقَدِمْنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُوا۟ مِنْ عَمَلٍۢ فَجَعَلْنَهُ هَبَآءًۭ مَّنثُورًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব, অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব৷৮

 

অর্থাৎ অমুসলিমদের আমলগুলো আখিরাতে হবে মূল্যহীন, ওজনহীন৷ ভোরবেলায় ঘরের পর্দা সরিয়ে দিলে যে সূর্যের আলো প্রবেশ করে, তাতে ঘুরপাক খায় বিক্ষিপ্ত ওজনহীন ধূলিকণা, একজন চাইলেও এগুলোকে জড় করতে পারে না। আখিরাতে অমুসলিমের আমলগুলো এই বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার মত ওজনহীন, মূল্যহীন হবে৷

 

কেউ যদি ঈমান থাকা সত্ত্বেও পাপাচারী হয়, তবে পাপের কারণে একটা নির্দিষ্ট সময় জাহান্নামে সে শাস্তি ভোগ করলেও, একদিন সে জান্নাতে প্রবেশ করবেই৷ হাদীসে বর্ণিত:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا

আবু সাঈদ আল খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: জান্নাতীরা জান্নাতে ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অত:পর আল্লাহ তাআলা বলবেন: যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে, তাকে [জাহান্নাম থেকে] বের কর, ফলে তাদেরকে সেখান থেকে বের করা হবে...৯

 

কিন্তু যে ঈমান ছাড়া মৃত্যুবরণ করবে, সে অনেক নেক আমল করলেও, ঈমান না থাকার কারণে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে৷ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِۦ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌۭ فَأُو۟لَٓئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَلُهُمْ فِى ٱلدُّنْيَا وَٱلْءَاخِرَةِ ۖ وَأُو۟لَٓئِكَ أَصْحَبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ

আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তার দ্বীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, বস্তুত এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখিরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তারাই আগুনের অধিবাসী৷ তারা সেখানে স্থায়ী হবে৷১০

 

সুতরাং সবার আগে ঈমান৷ ঈমান না থাকলে দুনিয়া ও আখিরাত ব্যর্থ৷ এই ঈমান আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ৷ মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের ওপর অটল থেকে ঈমানের হেফাযত করতে পারাই প্রকৃত সাফল্য৷

 

 

১সূরা আল মায়েদা, ৫ : ৭২৷

২সূরা আন নাহল, ১৬ : ৯৭৷

৩সূরা আন নিসা, ৪ : ১২৪৷

৪সূরা তাহা, ২০ : ১১২৷

৫সূরা আল ইসরা, ১৭ : ১৯৷

৬সূরা আল আম্বিয়া, ২১ : ৯৪৷

৭সহীহ মুসলিম৷

৮সূরা আল ফুরকান, ২৫ : ২৩।

৯বুখারী, মুসলিম।

১০সূরা আল বাকারা, ২ : ২১৭৷

উৎস:http://www.oiep.net/post/3

বিষয়শ্রেণী: দাওআত

লেখক: মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

আল্লাহ তাআলার আদেশ মেনে চলা ও তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকতে চাইলে একজন মুসলিমকে যে বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া উচিৎ, তা হল তার প্রাত্যহিক রুটিন৷ একজন মুসলিম কখন ঘুম থেকে উঠবে, রাতে কখন বিছানায় যাবে - এ সকল বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে৷

হাদীসে বর্ণিত:
عَنْ صَخْرٍ الْغَامِدِىِّ عَنِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « اللَّهُمَّ بَارِكْ لأُمَّتِى فِى بُكُورِهَا ». وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً أَوْ جَيْشًا بَعَثَهُمْ فِى أَوَّلِ النَّهَارِ. وَكَانَ صَخْرٌ رَجُلاً تَاجِرًا وَكَانَ يَبْعَثُ تِجَارَتَهُ مِنْ أَوَّلِ النَّهَارِ فَأَثْرَى وَكَثُرَ مَالُهُ. قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَهُوَ صَخْرُ بْنُ وَدَاعَةَ

সাখর আল গামিদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন: হে আল্লাহ আপনি দিনের অগ্রভাগে আমার উম্মাতের জন্য বরকত দিন৷ এবং তিনি যখন কোন ছোট বাহিনী কিংবা বড় দলকে অভিযানে পাঠাতেন, তাদের দিনের অগ্রভাগে পাঠাতেন৷ আর সাখর একজন ব্যবসায়ী ব্যক্তি ছিলেন৷ তিনি দিনের প্রথমভাগ থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করতেন, ফলে তিনি ধনাঢ্য হয়ে ওঠেন এবং তার সম্পদ বৃদ্ধি পায়৷১


এই হাদীস থেকে জানা যায় যে এই উম্মাতের মধ্যে কল্যাণ রয়েছে দিনের অগ্রভাগে৷ অতএব ফজরের সালাতের পর না ঘুমিয়ে যিকরে মশগুল থাকা এবং সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে এরপর কাজে নেমে পড়া মুসলিমদের জন্য বরকত তথা কল্যাণ বৃদ্ধি ও স্থায়ীত্বের কারণ হবে৷ আর যে ফজরের সালাতের সাথে সাথেই দিনের শুরু করতে চায়, তাকে রাতে আগেভাগেই বিছানায় যেতে হবে৷ এজন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার সালাতের পর কথাবার্তা বলা পছন্দ করতেন না৷ তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ এশার পরপর রাত্রির অগ্রভাগেই বিছানায় যেতেন, যেন শেষরাত্রিতে জেগে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারেন; অথবা অন্ততপক্ষে যেন ফজরের সালাতের সময় সতেজ দেহমন নিয়ে জেগে উঠতে পারেন৷ হাদীসে বর্ণিত:
وَكَانَ يَسْتَحِبُّ أَنْ يُؤَخِّرَ الْعِشَاءَ... وَكَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَهَا وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا

আর তিনি [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এশা বিলম্বিত করাকে পছন্দ করতেন,...আর তিনি এর পূর্বে ঘুমকে এবং এর পরে কথাবার্তাকে অপছন্দ করতেন৷২


আজ বহু মুসলিম পরিবারেই এর বিপরীত অভ্যাস দেখতে পাওয়া যায়৷ অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত রাত্রিজাগরণে অভ্যস্ত। তাদের অনেকেই ফজরের সালাত ঘুমিয়ে পার করে দেন৷ অনেকে রাত জেগে টেলিভিশন দেখে, ইন্টারনেটে ব্রাউজ করে কিংবা গল্পগুজব করে সময় কাটান, আর এগুলোর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধরনের গুনাহে লিপ্ত হন৷

অনেক ছাত্রদের ধারণা যে রাত জেগে লেখাপড়া করলে ভাল ফল পাওয়া যায়৷ কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত৷ কেউ রাত্রিতে যথেষ্ট ঘুমিয়ে ভোরে উঠে সতেজ দেহ-মন নিয়ে দু-ঘন্টায় যতটুকু পড়া করতে পারবে, তা হয়ত রাত জেগে চার ঘন্টা লেখাপড়ার সমান৷

অনেকে অভিযোগ করেন যে রাত্রি জাগরণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, আর এ অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না৷ এই অভ্যাস পরিবর্তনের সহজ উপায় আছে৷ কষ্ট করে কয়েকদিন ফজরের সময় ঘুম থেকে জেগে ওঠা এবং ফজরের সালাতের পর আর বিছানায় না যাওয়ার অনুশীলন করলে প্রথমে কষ্ট হলেও শীঘ্রই এটা অভ্যাসে পরিণত হবে৷ ফজরের পর ঘুম তাড়িয়ে রাখার জন্য প্রথমদিকে কিছু খেলাধূলা বা শারীরিক পরিশ্রম করা যেতে পারে৷ প্রয়োজনে অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য ছুটির সময়কে বেছে নেয়া যেতে পারে, যেন তা করতে গিয়ে কাজের ক্ষতি না হয়৷ মোটকথা ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব - এটি পরীক্ষিত৷

দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে আরও থাকতে পারে দিনের শেষভাগে খেলাধূলা ও শরীরচর্চা৷ সাহাবীগণ দিনের শেষভাগে, এমনকি মাগরিবের সালাত আদায় করেও তীর-নিক্ষেপ চর্চা করতেন৷ দিনের শেষভাগে কিছুটা শরীরচর্চা, হাঁটা বা খেলাধূলা করা রাত্রিতে ঘুমকে গভীর করতে সহায়ক হবে৷ এছাড়া দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তো আছেই - যার প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য-কর্তব্য৷

দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে আরও থাকা দরকার নিয়মিত দ্বীন-শিক্ষা ও কুরআন চর্চা৷ হঠাৎ বেশি পরিমাণে কোন আমল করার চেয়ে অল্প হলেও নিয়মিত আমল করাটা অধিক উপকারী এবং আল্লাহর কাছে বেশি পছন্দনীয়৷ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
« أَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ »

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় সে সমস্ত আমল, যা অল্প হলেও নিয়মিত করা হয়৷৩


তেমনি দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে থাকা উচিৎ নিকটাত্মীয়, বিশেষভাবে মা-বাবার খোঁজখবর নেয়া, তাঁদের প্রয়োজন পূরণ করা৷ এছাড়া স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সময় বরাদ্দ থাকা দরকার৷

এই সমস্ত দিকনির্দেশনা মেনে প্রাত্যহিক রুটিন ঠিক করে নিয়ে তা অনুসরণ করলে একজন মুসলিম সহজেই যাবতীয় পাপাচার থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা তার জন্য সহজতর হবে ইনশা আল্লাহ৷


১ আহমদ ও সুনান গ্রন্থসমূহের প্রণেতাগণ কর্তৃক বর্ণিত৷
২ বুখারী, মুসলিম৷
৩ বুখারী, মুসলিম৷

উৎস:http://www.oiep.net/post/1

বিষয়শ্রেণী: জীবনী

পরিচয়, জন্ম ও প্রতিপালনঃ
তিনি হলেন শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব বিন সুলায়মান বিন আলী বিন মুহাম্মাদ আত্ তামীমী (রঃ)। হিজরী ১১১৫ সালে তিনি নজদ অঞ্চলের উয়াইনা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। শিশুকালে তিনি স্বীয় পিতার নিকট প্রতিপালিত হন। তাঁর পিতা, চাচা এবং দাদাসহ পরিবারের অনেকেই বিজ্ঞ আলেম ছিলেন। সে হিসাবে তিনি একটি দ্বীনি পরিবেশে প্রতিপালিত হন। সে সময় শাইখের পরিবারের আলেমগণ শিক্ষকতা, ফতোয়া দান, বিচারকার্য পরিচালনা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি দায়িত্ব পালন করতেন। এ সমস্ত বিষয় দ্বারা সম্মানিত শাইখ শিশুকালেই বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।

শাইখের প্রখর মেধা ও প্রথামিক শিক্ষাঃ
তিনি উয়ায়নাতেই এবং পিতাসহ স্বীয় পরিবারের আলেমদের থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিশুকালেই তার মধ্যে বিরল ও অনুপম মেধার আলামত পরিলক্ষিত হয়। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর, বুঝশক্তি ছিল খুবই তীক্ষè এবং চিন্তাশক্তি ছিল খুবই গভীর। এ কারণেই তিনি অল্প বয়সেই ইলম অর্জনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। শৈশব কালেই তিনি সুদৃঢ় ঈমান ও দ্বীন পালনের প্রতি বিশেষ যত্মবান ছিলেন। ছোট বেলাতেই তিনি তাফসীর, হাদীছ এবং বিজ্ঞ আলেমদের কিতাবগুলো প্রচুর অধ্যয়ন করতেন। আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং সালফে সালেহীনদের আছারই ছিল শাইখের জ্ঞান অর্জনের মূল উৎস। দর্শন, সুফীবাদ, মানতেক ইত্যাদির সংস্পর্শ থেকে শাইখ ছিলেন সম্পূর্ণ দূরে। কারণ তিনি যেই পরিবার ও পরিবেশে প্রতিপালিত হন, তা ছিল বিকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা, পাপাচার এবং কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

শাইখের যুগে আরব উপদ্বীপের অবস্থাঃ
শাইখের যুগে নজদ ও তার আশেপাশের অঞ্চলে ব্যাপক আকারে শির্ক-বিদআত ও কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ে। আইয়্যামে জাহেলীয়াতের সকল প্রকার শির্কই পুনরায় আরব উপদ্বীপে নতুন পোষাকে প্রবেশ করে। গাছ, পাথর কবর এবং অলী-আওলীয়ার এবাদত শুরু হয়। এই দৃশ্য দেখে তিনি মর্মাহত হন এবং এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সুদৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

শাইখের চারিত্রিক গুণাবলীঃ
আমানতদারী, সত্যবাদিতা, মানুষের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ, দানশীলতা, ধৈর্যশীলতা, দূরদর্শিতা, দৃঢ়তা এবং তার মধ্যে আরো এমন চারিত্রিক উন্নত ও বিরল গুণাবলীর সমাহার ঘটেছিল, যা তাকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেছিল। ইতিহাসে যে সব মহাপুরুষ স্বীয় কর্মের মাধ্যমে প্রসিদ্ধতা অর্জন করেছেন তাদের খুব অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যেই এই চারিত্রিক গুণাবলী বিদ্যমান ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি খুব বিনয়ী ছিলেন, সায়েল ও অভাবীদের প্রয়োজন পূরণে বিশেষ তৎপর ছিলেন।
তাঁর বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে কঠোরতা, অজ্ঞতা এবং দ্বীন পালনে দুর্বলতা ইত্যাদি যেসব অভিযোগ করে থাকে, শাইখ ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

উচ্চা শিক্ষা ও ভ্রমণঃ
উয়ায়নার আলেমদের কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ সমাপ্ত করার পর তিনি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য হিজায ও শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করেন। যৌবনে পদার্পন করে তিনি হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে গমণ করেন। হজ্জ শেষে মদীনায় গিয়ে তিনি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইবরাহীম বিন সাইফ নামক প্রখ্যাত আলেমের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধির নিকট ইলমে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি ইরাকের বসরায় গমণ করেন এবং সেখানকার শাইখ মাজমুয়ীর নিকট তাওহীদ ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। সেখানে থাকা অবস্থাতেই তিনি শির্ক ও বিদআত বিরোধী প্রকাশ্য আলোচনা শুরু করেন। ফলে বসরার বিক্ষুদ্ধ বিদআতীরা তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেয়।

উয়াইনায় ফিরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং দাওয়াতী কাজে মনোনিবেশঃ
ইরাক থেকে ফিরে এসে শাইখ নিজ জন্মস্থান উয়ায়নায় বসবাস করতে থাকেন। তখন উয়ায়নার শাসক ছিলেন উছমান বিন মুহাম্মাদ বিন মুআম্মার। তিনি উছমানের নিকট গেলেন। উছমান শাইখকে স্বাগত জানালেন এবং বললেনঃ আপনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিতে থাকুন। আমরা আপনার সাথে থাকবো এবং আপনাকে সাহায্য করবো। উছমান এমনি আরো ভালো কথা বললেন, শাইখের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করলেন এবং তাঁর দাওয়াতের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করলেন।


উছমানের আশ্বাস পেয়ে শাইখ মানুষকে আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা দান, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ করাসহ কল্যাণের দিকে আহবান করতে থাকলেন। শাইখের দাওয়াত উয়ায়নার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে পার্শ্ববর্তী সকল গ্রামের মানুষ শাইখের কাছে আসতে থাকলো এবং নিজেদের ভুল আকীদাহ বর্জন করে শাইখের দাওয়াত কবুল করতে লাগল।
ঐ সময় জুবাইলা নামক স্থানে যায়েদ বিন খাত্তাব নামে একটি মিনার ছিল। যায়েদ বিন খাত্তাব ছিলেন উমার (রাঃ)এর ভাই। তিনি মিথ্যুক নবী মুসায়লামার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকেরা তার কবরের উপর গম্বুজ তৈরী করে। কালক্রমে তা এক দেবতা মন্দিরে পরিণত হয়। এতে বিভিন্ন ধরণের মানত পেশ করা হতো এবং কাবা ঘরের ন্যায় তাওয়াফও করা হতো। সেখানে আরো অনেক কবর ছিল। আশেপাশের গাছপালারও এবাদত হতো।


একদা শাইখ আমীর উছমানকে বললেনঃ চলুন আমরা যায়েদ বিন খাত্তাবের কবরের উপর নির্মিত গম্বুজটি ভেঙে ফেলি। কেননা এটি অন্যায়ভাবে এবং বিনা দলীলে নির্মাণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই কাজের প্রতি কখনই সন্তুষ্ট হবেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপর কোন কিছু নির্মাণ করতে এবং কবরকে মসজিদে পরিণত করতে নিষেধ করেছেন। এই গম্বুজটি মানুষকে গোমরাহ করছে, মানুষের আকীদাহ পরিবর্তন করছে এবং এর মাধ্যমে নানা রকম শির্ক হচ্ছে। সুতরাং এটি ভেঙে ফেলা আবশ্যক।
আমীর উছমান বললেনঃ এতে কোন অসুবিধা নেই। অতঃপর উছমান বিন মুআম্মার গম্বুজটি ভাঙ্গার জন্য ৬০০ সৈনিকের একটি বাহিনী নিয়ে বের হলেন। শাইখও তাদের সাথে ছিলেন।
উছামানের বাহিনী যখন জুবাইলিয়ার নিকটবর্তী হলো এবং জুবাইলিয়ার অধিবাসীরা জানতে পারলো যে, যায়েদ বিন খাত্তাবের মিনার ভাঙ্গার জন্য একদল লোক আগমণ করেছে তখন তারা গম্বুজটি রক্ষা করার জন্য বের হলো। কিন্তু আমীর উছমান এবং তাঁর সৈনিককে দেখে তারা ফিরে গেল। উছমানের সৈনিকরা গম্বুজটি গুড়িয়ে দিল। শাইখের প্রচেষ্টায় এই মিনারটি ভেঙে ফেলা হয় এবং তিনি শাইখ নিজেও ভাঙ্গার কাজে অংশ নেন।


আলহামদুলিল্লাহ। চিরতরে শির্কের একটি আস্তানা বিলুপ্ত হলো। এমনি শির্কের আরো অনেক আস্তানা আল্লাহ তাআলা সম্মানিত শাইখের মাধ্যমে বিলুপ্ত করলেন।

ব্যভিচারের হদ্দ (শাস্তি) কায়েমঃ
উয়ায়নাতে অবস্থানকালে এক মহিলা একদিন তাঁর কাছে এসে স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে ব্যভিচারের অপরাধ স্বীকার করে বিচার প্রার্থনা করে। মহিলাটির অবস্থা স্বাভাবিক কি না, তা জানার জন্য তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন, মহলিাটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং তার মাথায় কোন পাগলামী নেই, তখন মহিলাটিকে বললেনঃ সম্ভবতঃ জবরদস্তি করে তোমার সাথে এই অপকর্ম করা হয়েছে। সুতরাং তোমার বিচার প্রার্থনা করার দরকার নেই। অবশেষে মহিলাটি জোর দাবী জানালে এবং বার বার স্বীকার করতে থাকলে তিনি লোকদেরকে নির্দেশ দিলে তারা পাথর মেরে মহিলাটিকে হত্যা করে ফেলে।
উয়ায়নাতে উছমান বিন মুআম্মারের সহযোগিতায় ও সমর্থনে শাইখের সংস্কার আন্দোলন যখন পুরোদমে চলতে থাকে, তখন আহসার শাসক সুলায়মান বিন আব্দুল আযীযের কাছে এই খবর পৌঁছে গেল। শাইখের বিরোধীরা সুলায়মানকে জানিয়ে দিল যে, শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব নামে এক ব্যক্তি কবরের উপর নির্মিত গম্বুজগুলো ভেঙে ফেলছে এবং ব্যভিচারের শাস্তিও কায়েম করছে। আহসার আমীর এতে রাগান্বিত হলো এবং সে উয়ায়নার আমীর উছমানকে এই মর্মে পত্র লিখলো যে, আপনি অবশ্যই এই লোকটিকে (শাইখকে) হত্যা করবেন। অন্যথায় আমরা আপনাকে খিরাজ (টেক্স) দেয়া বন্ধ করে দিবো।
উল্লেখ্য যে, আহসার এই গ্রাম্য অশিক্ষিত শাসক উছমানকে বিরাট অংকের টেক্স প্রদান করতো। তাই উছমান পত্রের বিষয়টিকে খুব বড় মনে করলেন এবং এই আশঙ্কা করলেন যে, শাইখের দাওয়াতের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখলে আহসার খিরাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের পক্ষ হতে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঘেষণারও ভয় রযেছে।
তাই তিনি শাইখকে পত্রের বিষয় অবগত করলেন এবং আহসার শাসকের পত্র মুতাবেক আমরা আপনাকে হত্যা করা সমীচিন মনে করছিনা। আপনাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করাও এখন থেকে আর সম্ভব হবেনা। কারণ আমরা আহসার শাসক সুলায়মানকে খুব ভয় করছি। আমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও সক্ষম নই। সুতরাং আপনি যদি আমাদের কল্যাণ ও আপনার নিজের কল্যাণ চান, তাহলে আমাদের নিকট থেকে চলে যান।


শাইখ তখন বললেনঃ আমি যেই বিষয়ের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি, তা তো আল্লাহর দ্বীন। এটিই তো কালেমা তাইয়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহএর দাবী। যে ব্যক্তি এই দ্বীনকে মজবুতভাবে ধারণ করবে, ইহার সাহায্য করবে এবং দৃঢ়তার সাথে এই দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করবেন এবং তাঁর শত্র“দের উপর তাকে বিজয় দান করবেন। সুতরাং আপনি যদি ধৈর্য ধারণ করেন এবং দ্বীনের উপর অটল থাকেন এবং এই দাওয়াতের প্রতি সাহায্য ও সমর্থন অব্যাহত রাখেন, তাহলে আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ আপনাকে অচিরেই বিজয় দান করবেন এবং এই গ্রাম্য যালেম শাসক ও তার বাহিনী থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন। সেই সাথে আল্লাহ আপনাকে তার অঞ্চল ও তার গোত্রের শাসনভার আপনার হাতেই সোপর্দ করবেন।
এতে উছমান বললেনঃ হে সম্মানিত শাইখ! তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই এবং তার বিরোধীতা করার মত ধৈর্যও আমাদের নেই।

দরঈয়ায় হিজরত এবং দরঈয়ার আমীর মুহাম্মাদ বিন সঊদের সাথে সাক্ষাতঃ
পরিশেষে উছমান বিন মুআম্মারের অনুরোধে বাধ্য হয়ে শাইখ উয়ায়না থেকে বেরিয়ে পড়লেন। উয়ায়না ছেড়ে তিনি দরঈয়ায় হিজরত করলেন। বলা হয়ে থাকে যে, বের হওয়ার সময় শাইখ পায়ে হেঁটে বের হন। কারণ উছমান শাইখের জন্য কোন বাহনের ব্যবস্থা করেন নি। তাই সকাল বেলা বের হয়ে সারাদিন পায়ে হেঁটে বিকাল বেলা দরঈয়ায় গিয়ে পৌঁছেন। দরঈয়ায় পৌঁছে তিনি একজন ভাল মানুষের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার নাম মুহাম্মাদ বিন সুয়াইলিম আল উরায়নী। এই লোকটি শাইখকে একদিকে যেমন আশ্রয় দিলেন, অন্যদিকে আমীর মুহাম্মাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্তও হয়ে পড়লেন। কিন্তু শাইখ তাকে এই বলে শান্ত করলেন যে, আমি যেদিকে মানুষকে দাওয়াত দিচ্ছি, তা হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন। অচিরেই আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে বিজয়ী করবেন। যাই হোক আমীর মুহাম্মাদের কাছে শাইখের খবর পৌঁছে গেল।
বলা হয় যে, একদল ভাল লোক প্রথমে আমীরের স্ত্রীর কাছে গিয়ে শাইখের দাওয়াতের বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন। আমীরের স্ত্রী ছিলেন একজন ভাল ও দ্বীনদার মহিলা। তারা আমীরের স্ত্রীকে বললেনঃ আপনার স্বামী মুহাম্মাদকে বলুন, তিনি যেন শাইখের দাওয়াত কবুল করেন এবং তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।


অতঃপর যখন আমীর মুহাম্মাদ বাড়িতে আসলেন, তখন তিনি বললেনঃ আপনার অঞ্চলে বিরাট এক গণীমত আগমণ করেছে। আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা নিজেই আপনার নিকট এই গণীমত পাঠিয়েছেন। আপনার এলাকায় এমন একজন লোক আগমণ করেছেন, যিনি আল্লাহর দ্বীনের দিকে মানুষকে আহবান করেন, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের দিকে দাওয়াত দেন। কত সুন্দর এই গণীমত! সুতরাং আপনি দ্রুত তাকে কবুল করে নিন এবং তাকে সাহায্য করুন। খবরদার! আপনি কখনই এ থেকে পিছপা হবেন না।
আমীর মুহাম্মাদ তাঁর স্ত্রীর এই মূল্যবান পরামর্শ গ্রহণ করলেন। অতঃপর তিনি ইতস্ততঃবোধ করছিলেন। তিনি নিজেই শাইখের কাছে যাবেন? না শাইখকে নিজের কাছে ডেকে আনবেন? এবারও তাঁর স্ত্রী তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, শাইখকে আপনার কাছে ডেকে আনা ঠিক হবেনা। বরং শাইখ যেখানে অবস্থান করছেন, আপনাকেই সেখানে যাওয়া উচিত। কেননা ইলম এবং দ্বীনের দাঈর সম্মানকে সমুন্নত রাখার স্বার্থেই তা করা উচিত। আমীর মুহাম্মাদ এবারও তার স্ত্রীর পরামর্শ কবুল করে নিলেন।


আমীর মুহাম্মাদ বিন সঊদ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য মুহাম্মাদ বিন সুওয়াইলিমের বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে শাইখকে সালাম দিলেন এবং তাঁর সাথে আলোচনা করলেন। পরিশেষে তিনি বললেনঃ হে শাইখ! আপনি সাহায্যের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, নিরাপত্তার সুসংবাদ গ্রহণ করুন এবং সর্ব প্রকার সাহায্য-সহযোগিতারও সুসংবাদ গ্রহণ করুন।
জবাবে শাইখও আমীরকে আল্লাহর সাহায্য, বিজয়, প্রতিষ্ঠা এবং শুভ পরিণামের সুসংবাদ প্রদান করলেন। শাইখ আরো বললেনঃ এটি হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন। যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করবে, আল্লাহও তাকে সাহায্য করবেন, শক্তিশালী করবেন। অচিরেই আপনি এর ফল দেখতে পাবেন।


অতঃপর আমীর মুহাম্মাদ বললেনঃ হে শাইখ আমি আপনার হাতে বায়আত করবো। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের দ্বীনের উপর এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার। তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে আমরা যখন আমাকে সমর্থন করবো, আপনাকে সাহায্য করবো এবং আল্লাহ তাআলা যখন শত্র“দের উপর আপনাকে বিজয় দান করবেন, তখন আপনি আমাদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান কি না।
শাইখ জবাবে বললেনঃ এমনটি কখনই হবেনা। আমার রক্ত আপনাদের রক্ত আমারই রক্ত, আপনাদের ধ্বংস আমারই ধ্বংস। আপনার শহর ছেড়ে আমি কখনই অন্যত্র চলে যাবোনা।
অতঃপর আমীর মুহাম্মাদ শাইখকে সাহায্য করার বায়আত করলেন এবং শাইখও অঙ্গিকার করলেন যে, তিনি আমীরের দেশেই থাকবেন এবং আমীরের সহযোগী হিসাবেই কাজ করবেন ও আল্লাহর দ্বীনের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবেন। এভাবেই ঐতিহাসিক বায়আত সম্পন্ন হলো।

শাইখের দাওয়াতের নতুন যুগঃ
এভাবে শাইখের দাওয়াত এক নতুন যুগে প্রবেশ করল। দরঈয়ার আমীরের সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করার অঙ্গিকার পেয়ে শাইখ নতুন গতিতে নির্ভয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন। প্রত্যেক অঞ্চল থেকে দলে দলে লোকেরা দরঈয়ায় আসতে লাগল। শাইখ সম্মান ও ইজ্জতের সাথে এখানে বসবাস করতে লাগলেন এবং তাফসীর, হাদীছ, আকীদাহ, ফিক্হসহ দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে র্দাস দানে মশগুল হয়ে পড়লেন। নিয়মিত দারস্ দানের পাশাপশি সমর্থক ও সাথীদেরকে নিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে শির্কের আস্তানা গুড়িয়ে দিতে থাকেন এবং যেসব মাজারে হাদীয়া-তোহফা পেশ করা হতো তা একের এক উচ্ছেদ করতে থাকেন।
শাইখ যখন দরঈয়ায় আসলেন তখন জানতে পারলেন যে, সেখানে এমন একটি খেজুর গাছ রয়েছে, যাকে الفحل ফাহল বা ফাহ্হাল বলা হতো। এই খেজুর গাছের ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল, কোন মহিলার বিয়ে হতে দেরী হলে কিংবা তাকে বিয়ের জন্য কেউ প্রস্তাব না দিলে এই খেজুর গাছটির গাছটিকে জড়িয়ে ধরত এবং বলতোঃ أريد زوجا قبل الحول يا فحل الفحول হে সকল পুরুষের সেরা পুরুষ! বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তোমার কাছে একজন পুরুষ চাই। তাদের ধারণায় এভাবে এই গাছকে জড়িয়ে ধরলে অবিবাহিত মহিলাদের দ্রুত বিয়ে হতো এবং বিয়ে হয়ে গেলে তারা এই গাছকেই বিয়ে হওয়ার কারণ মনে করতো। তাদের মুর্খতা এতদূর গিয়ে পৌঁছেছিল যে, কোন মহিলা গাছটিকে জড়িয়ে ধরার পর যখন তার বিয়ের প্রস্তাব আসতো, তখন তারা বলতোঃ তোমাকে এই গাছটি সাহায্য করেছে। অতঃপর শাইখের আদেশে গাছটিকে কেটে ফেলা হয়। আল্লাহ তাআলা শির্কের এই মাধ্যমটিকে চিরতরে মিটিয়ে দিলেন।


এভাবেই আল্লাহ তাআলা শাইখের দাওয়াতকে দরঈয়াতে সফলতা দান করলেন। পরবর্তীতে সমগ্র আরব উপদ্বীপ এবং পার্শ্ববর্তী আরব দেশসমূহ এবং সারা বিশ্বেই এই দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ল।
আল্লাহ তাআলা তাঁর অন্তরকে তাওহীদের জ্ঞান অর্জন ও তা বাস্তবায়নের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। সেই সাথে যেসব বিষয় তাওহীদের বিপরীত এবং যা মানুষের তাওহীদকে নষ্ট করে দেয় সেসব বিষয় সম্পর্কেও শাইখ গভীর পারদর্শিতা অর্জন করেন।


শাইখ তাওহীদের দাওয়াতকে পুনরুজ্জিবীত করার জন্য সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং নবী-রাসূলদের দাওয়াতের মূল বিষয় তথা তাওহীদে উলুহীয়াতের দাওয়াত দেয়ার শুরু করেন এবং শির্ক ও বিদআতের প্রতিবাদ করেন। তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার পাশাপাশি তাঁর একাধিক ইলমী মজলিস ছিল। প্রতিদিন তিনি তাওহীদ, তাফসীর, ফিকাহ এবং অন্যান্য বিষয়ে একাধির দারস্ প্রদান করতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দাওয়াতের মধ্যে বরকত দান করলেন। ফলে আরব উপদ্বীপের লোকেরা তাঁর দাওয়াত কবুল করে শির্ক, বিদআত ও কুসংস্কারের অন্ধকার পরিহার করে তাওহীদের আলোর দিকে ফিরে আসলো। তাঁর বরকতময় দাওয়াত অল্প সময়ের মধ্যেই আরব উপদ্বীপের সীমা পার হয়ে ইরাক, মিশর, সিরিয়া, মরোক্ক, ভালতবর্ষসহ পৃথিবীর সকল অঞ্চলেই পৌঁছে যায়। ফলে তিনি ১২শ শতকের মুজাদ্দেদ তথা তাওহীদের দাওয়াতের সংস্কারক উপাধিতে ভূষিত হন।


সে সময়ের দরঈয়ার শাসক সম্প্রদায়ও শাইখের দাওয়াতকে কবুল করে নেন এবং সাহায্য করেন। এতে শাইখের দাওয়াত নতুন গতি পেয়ে দ্রুত প্রসারিত হতে থাকে। বর্তমানে সৌদি আরবসহ সারা বিশ্বে যেই তাওহীদের দাওয়াত চলছে, শাইখের দাওয়াতের দ্বারাই প্রভাবিত। আল্লাহ যেন এই দাওয়াকে কিয়ামত পর্যন্ত চালু রাখেন। আমীন।

শাইখের দাওয়াতের মূলনীতিঃ
পরিশুদ্ধ ইসলামী মানহাজ এবং দ্বীনের সঠিক মূলনীতির উপর শাইখের দাওয়াত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই দাওয়াতের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল, এবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে যে সমস্ত মূলনীতির ভিত্তিতে শাইখের দাওয়াতী কর্মতৎপরতা পরিচালিত হতো, নিম্নে তা থেকে কয়েকটি মূলনীতি নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ


১) মানুষের অন্তরে তাওহীদের শিক্ষা বদ্ধমূল করা এবং শির্ক ও বিদআতের মূলোৎপাটন করা। মুসলিমদের অন্তরে এই মূলনীতিকে সুদৃঢ় করার জন্যই তিনি প্রয়োজন পূরণের আশায় কবর যিয়ারত করা, কবরবাসীর কাছে দুআ করা, কিছু চাওয়া, রোগমুক্তি ও বিপদাপদ থেকে উদ্ধার লাভের আশায় তাবীজ ঝুলানো, গাছ ও পাথর থেকে বরকত গ্রহণ করা, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের জন্য পশু যবেহ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য মানত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে আশ্রয় চাওয়া, কবর পূজা করা, আল্লাহ ও বান্দার মাঝে উসীলা নিধারণ করা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যান্য অলী-আওলীয়ার কাছে শাফাআত চাওয়াসহ যাবতীয় শির্ক কর্জন করার উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন।


২) নামায কায়েম করা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করাসহ দ্বীনের অন্যান্য ফরয ও নিদর্শনগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা।


৩) সমাজে ন্যায় বিচার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর হদ্দ তথা নির্ধারিত দন্ডবিধি কায়েম করা।


৪) তাওহীদ, সুন্নাহ, ঐক্য, সংহতি, সম্ভ্রম, নিরাপত্তা এবং ন্যায় বিচারকে মূলভিত্তি করে একটি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।


যে সমস্ত অঞ্চলে শাইখের দাওয়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আরব উপদ্বীপের যেই এলাকাগুলো এই দাওয়াতের দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে, সেখানে উপরোক্ত মূলনীতিগুলোর সবই বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সংস্কার আন্দোলনের পতাকাবাহী সৌদি আরবের প্রতিটি স্তরেই এর প্রভাব সুস্পষ্টরূপে পরিলক্ষিত হয়েছে। এই দাওয়াত যেখানেই প্রবেশ করেছে, সেখানেই তাওহীদ, ঈমান, সুন্নাত, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রবেশ করেছে। এতে আল্লাহর ওয়াদা ও অঙ্গিকার বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করবেন। যেমন তিনি প্রতিষ্ঠা দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের সেই দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য”। (সূরা হজ্জঃ ৫৫)
وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ (৪০) الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآَتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
“যারা আল্লাহ্র সাহায্য করে, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী শক্তিধর। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। আর সমস্ত বিষয়ের পরিণাম আল্লাহ্র হাতে”। (সূরা নূরঃ ৪০-৪১)

শাইখের বিরোধীতা ও তার উপর মিথ্যাচারঃ
সত্যের অনুসারী এবং সত্যের পথে যারা আহবান করেন, তারা কোন যুগেই বাতিলপন্থীদের হিংসা, বিদ্বেষ, শত্র“তা ও তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পান নি। যেমন রেহাই পান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা নবী-রাসূলগণ। আমাদের সম্মানিত শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রঃ) যখন সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন এবং সাহসিকতা ও বলিষ্ঠতার সাথে শির্ক, বিদআত ও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক কুসংস্কারের প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন বিদআতী আলেমরা তাঁর ঘোর বিরোধীতা শুরু করে। তাঁর বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করে। এমনকি এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী লোক সমসাময়িক শাসকদের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। তাঁকে একাধিকার হত্যা করারও প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিরোধীদের সকল ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়। আল্লাহর ইচ্ছা অতঃপর শাইখের সৎসাহস ও নিরলস কর্ম তৎপরতার মুকাবেলায় বিরোধীদের সকল প্রচেষ্টাই বর্থ হয় এবং আল্লাহর দ্বীন ও তাওহীদের দাওয়াতই বিজয় লাভ করে।


বর্তমানেও আমাদের ভারত বর্ষে যে সমস্ত আলেম ও দাঈ সহীহ আকীদাহ ও আমলের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন, অতীতের ন্যায় তারাও বিরোধীদের নানা রকম অপবাদ ও অভিযোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই বরকতময় দাওয়াত থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য এক শ্রেণীর লোক সহীহ আকীদার অনুসারীদেরকে ওয়াহাবী এবং নির্ভেজাল তাওহীদের দাওয়াতকে ওয়াহাবী আন্দোলন বলে গালি দেয়াসহ নানা অপবাদ দিয়েছে যাচ্ছে। এত কিছুর পরও আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবাণীতে এবং দ্বীনের মুখলিস আলেম ও দাঈদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশসহ ভারত বর্ষের প্রত্যেক অঞ্চলেই এই দাওয়াতের প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে লক্ষণীয়। আগামী দিনগুলোতে ব্যাপক হারে এই দাওয়াতের সাথে আমাদের দেশের লোকেরা সম্পৃক্ত হবে, আমাদের সামনে এই লক্ষণ অতি সুস্পষ্ট।

শাইখের বিরুদ্ধে কতিপয় অভিযোগ ও তার জবাবঃ
বিদআতীদের পক্ষ হতে শাইখের বিরুদ্ধে সে সময় অনেকগুলো অভিযোগ পেশ করা হয়ে থাকে। সম্ভবতঃ বর্তমানকালেও তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলো ছাড়া অন্য কোন অভিযোগ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। অভিযোগগুলো নিম্নরূপঃ


১) শাইখ অলী-আওলীয়াদের কবরে মানত পেশ করা ও কবরকে সম্মান করা এবং কবরের উদ্দেশ্যে সফর করা বন্ধ করে দিয়েছেন।


২) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু যবেহ করা হারাম করেছেন।


৩) আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া, শাফাআত চাওয়া এবং অলী-আওলীয়াদের উসীলা দেয়াকে হারাম ঘোষণা করেছেন।


৪) শাইখ নিজ মতের বিরোধীদের সাথে যুদ্ধে করেছেন এবং অন্যায়ভাবে তাদেরকে হত্যা করেছেন। এমননি আরো অনেক অভিযোগ শাইখের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়ে থাকে।


আসলে এইগুলো কোন অভিযোগের আওতায় পড়েনা। এগুলো এমন বিষয়, যা কুরআন ও হাদীছের সুস্পষ্ট দলীল দ্বারাই হারাম করা হয়েছে। তাঁর পূর্বে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এবং তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) এ ধরণের শির্ক-বিদআতের জেরালো প্রতিবাদ করেছেন। ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে যার সামান্য জ্ঞান রয়েছে সেও বুঝতে সক্ষম হবে যে, উপরোক্ত বিষয়গুলোর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। দ্বীনের সঠিক শিক্ষা না থাকার কারণে, তাওহীদের আলো নিভে যাওয়ার সুযোগে এবং সর্বত্র মুর্খতা, পাপাচারিতা ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে মুসলিম সমাজে উক্ত কুসংস্কার গুলোও ঢুকে পড়েছিল। উক্ত কাজগুলো ইসলামী শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে এবং তাওহীদের সরাসরি বিরোধী হওয়ার কারণে শাইখ মুসলিমদেরকে সঠিক দ্বীনের দিকে ফিরে আসার আহবান জানিয়েছেন। এটি শুধু তার একার দায়িত্ব ছিলনা; বরং সকল আলেমের এই দায়িত্ব ছিল। তাই শাইখের দাওয়াত ছিল সম্পূর্ণ তাওহীদ ও সুন্নাহ ভিত্তিক। এটি ছিল একটি সংস্কার আন্দোলন।
তাঁর বিরুদ্ধে ওয়াহাবী মাযহাব নামে পঞ্চম মাযহাব তৈরীরও অভিযোগ পেশ করা হয়ে থাকে। এটিও একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ। শাইখ কোন মাহাব তৈরী করেন নি; বরং মুসলিমদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে আহবান জানিয়েছেন। তা ছাড়া তাঁর কিতাবাদি পড়লে বুঝা যায় দ্বীনের শাখা ও ফিকহী মাসায়েলের ক্ষেত্রে হান্বালী মাযহাবের প্রতি তাঁর ঝুক ছিল। তবে তিনি মাজহাবী গোঁড়ামির সম্পূর্ণ উর্ধ্বে ছিলেন।
শাইখের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, তিনি বিরোধেিদরকে হত্যা করেছেন। এই অভিযোগও সঠিক নয়। কারণ যারা তার বিরুদ্ধে এবং তাওহীদের দাওয়াতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে, তিনি কেবল তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। তাঁর জিহাদ ছিল শরঈ জিহাদ। সুতরাং সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসে যারা নিহত হয়েছে, তাদেরকে তিনি অন্যায়ভাবে হত্যা করেছেন- এই অভিযোগ ঠিক নয়।
অনেকে তাকে হাদিছে বর্ণিত ‘নাজদ’এর ফিতনা বলে আখ্যায়িত করে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাদের শাম এবং ইয়ামানে বরকত দান করো। সকলে বললঃ আর আমাদের নাজদে ? তিনি বললেন, ওখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হবে। (বুখারি ও মুসলিম)


ইবনে হাযার আস্কালানীসহ অন্যান্য আলেমগণ বলেনঃ হাদিছে উল্লেখিত নাজদ হল ইরাকের নাজদ শহর। আর ইরাকেই সকল বড় বড় ফিতনা দেখা দিয়েছে। আলী (রাঃ) এবং হুসাইন (রাঃ)এর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইরাক শান্ত হয়নি। সেখানের ফিতনার কারণেই আলী (রাঃ) কুফায় এবং হোসাইন (রাঃ) কারবালায় শাহাদাত বরণ করেন। হেজাযের নাজদে কোন ফিতনাই দেখা যায়নি। যেমনটি ইরাকে দেখা দিয়েছে। সুতরাং হেজাযের নাজদ থেকে শাইখের যেই তাওহীদি দাওয়াত প্রকাশিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরেছে, তা ছিল নাবী-রাসূলদেরই দাওয়াত। সুস্পষ্ট বিদআতী আর অন্ধ ছাড়া কেউ এই দাওয়াতকে নাজদের ফিতনা বলতে পারেনা।

শাইখের দাওয়াতের ফলাফলঃ
শাইখের বরকতময় দাওয়াতের ফলে আরব উপদ্বীপসহ পৃথিবীর বহু অঞ্চল থেকে শির্ক-বিদআত ও দ্বীনের নামে নানা কুসংস্কার উচ্ছেদ হয়। যেখানেই এই দাওয়াত প্রবেশ করেছে, সেখানেই তাওহীদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হকপন্থীগন সম্মানিত হয়েছেন। হাজীগণ সারা বিশ্ব হতে মক্কা ও মদীনায় আগমণ করে শাইখের দাওয়াত পেয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত প্রচার করতে থাকেন। বাদশাহ আব্দুল আযীযের যুগে সুবিশাল সৌদি আরব তাওহীদের এই দাওয়াতের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এই দাওয়াতের ফল ভোগ করছেন সৌদি রাজ পরিবার ও তার জনগণ। বিশ্বের যেখানেই কুরআন, সুন্নাহ এবং সহীহ আকীদার দাওয়াত ও শির্ক-বিদআতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে, তা শাইখের এই বরকতময় দাওয়াতেরই ফসল। হে আল্লাহ! তুমি কিয়ামত পর্যন্ত তাওহীদের এই দাওয়াতকে সমুন্নত রাখো। আমীন।
শাইখের ছাত্রগণঃ
তাঁর নিকট থেকে অগণিত লোক তাওহীদ ও দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন।
তাদের মধ্যেঃ
১) শাইখের চার ছেলে হাসান, আব্দুল্লাহ্, আলী এবং ইবরাহীম। তাদের প্রত্যেকেই ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেিেছলেন।
২) তাঁর নাতী শাইখ আব্দুর রাহমান বিন হাসান।
৩) শাইখ আহমাদ বিন নাসের বিন উছমান এবং আরো অনেকেই।
শাইখের ইলমী খেদমতঃ
শাইখের রয়েছে ছোট বড় অনেকগুলো সুপ্রসিদ্ধ কিতাব। তার মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও আলোচিত হচ্ছে আমাদের সামনের এই কিতাবুত্ তাওহীদ। শাইখের আরো যেসমস্ত গ্রন্থ রয়েছে, তার মধ্যেঃ
(১) কাশফুস শুবুহাত।
(২) আল উসূলুস ছালাছাহ ওয়া আদিল্লাতুহা।
(৩) উসূলুল ঈমান।
(৪) তাফসীরুল ফাতিহা।
(৫) মাসায়িলুল জাহেলিয়াহ।
(৬) মুখতাসার যাদুল মাআদ
(৭) মুখতাসার সিরাতুর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আরো অন্যান্য কিতাব।

শাইখের মৃত্যুঃ
হিজরী ১২০৬ সালের যুল-কাদ মাসের শেষ তারিখে ৯২ বছর বয়সে শাইখ দরঈয়ায় মৃত্যু বরণ করেন। হে আল্লাহ! তুমি শাইখকে তোমার প্রশস্ত রহমত দ্বারা আচ্ছাদিত করে নাও।

উৎস:http://www.jamiyat.org.bd/archives/3798

বিষয়শ্রেণী: ইলম (জ্ঞান)

লেখক: শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী

‘রূহ’ এবং নাফ্স (প্রাণ) কি দু’টি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়? না কি একই জিনিষের দু’টি নাম? এ বিষয়েও লোকেরা মতভেদ করেছে। সঠিক কথা হচ্ছে অনেকগুলো বিষয় বুঝাতে নাফস্ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এমনি ‘রূহ’ শব্দটিও একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর কখনো নাফ্স এবং ‘রূহ’ একই অর্থে আসে আবার কখনো উভয়টি আলাদা আলাদা অর্থে ব্যবহৃত হয়।
সুতরাং নাফ্স সাধারণত ‘রূহ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে ‘রূহ’ যখন শরীরের সাথে যুক্ত থাকে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নাফ্স বলা হয়। আর যখন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখন অধিকাংশ সময় ‘রূহ’ হিসাবেই নাম দেয়া হয়। নাফ্সকে রক্তও বলা হয়। হাদীছে এসেছে, যেই প্রাণীর রক্ত প্রবাহিত হয়না, তা পানিতে পড়ে মারা গেলে পানি নাপাক হয়না।
বদনযরকেও নাফ্স বলা হয়। যেমন বলা হয়, أصابت فلانا نفس অর্থাৎ অমুক ব্যক্তির উপর বদনযর লেগেছে। যাত অর্থাৎ ব্যক্তি সত্তাকেও নাফ্স বলা হয়। যেমন আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ
﴿ فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ﴾
“তবে গৃহে প্রবেশ করার সময় তোমরা নিজেদের লোকদের সালাম করো (গ্রহবাসীদেরকে সালাম দাও), এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত করকতময় ও পবিত্র অভিবাদন স্বরূপ৷ এভাবে আল্লাহ তোমাদের সামনে আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন। আশা করা যায় তোমরা বুঝে শুনে কাজ করবে”। (সূরা নূরঃ ৬১) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ ۚ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পর¯পরের ধন-স¤পদ অন্যায়ভাবে খেয়ে ফেলোনা৷ তবে পার¯পরিক রেযামন্দির ভিত্তিতে যদি ব্যবসার মাধ্যমে হয়, তাহলে সে কথা ভিন্ন। আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা৷ নিশ্চিয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি মেহেরবান”। (সূরা নিসাঃ ২৯) এ রকম আরো আয়াত রয়েছে।
কিন্তু ‘রূহ’ শব্দটি কখনোই শরীর অর্থে ব্যবহৃত হয়না। ‘রূহ’ দেহ থেকে আলাদা হওয়ার পরেও ‘রূহ’কে শরীর বলা হয়না এবং নাফ্সের সাথে মিলিত থাকা অবস্থায়ও ‘রূহ’কে শরীর বলা হয়না। কুরআনকেও ‘রূহ’ বলা হয়। জিবরীল ফেরেশতাকেও রূহ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
﴿وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا ۚ مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَٰكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ﴾
“এভাবেই (হে মুহাম্মাদ) আমি আমার নির্দেশে তোমার কাছে এক ‘রূহ’কে অহী করেছি৷ তুমি আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি৷ কিন্তু সেই ‘রূহ’কে আমি একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ দেখিয়ে থাকি৷ নিশ্চিয়ই আমি তোমাকে সোজা পথের দিক নির্দেশনা দান করছি৷ (সূরা শুরাঃ ৫২) ‘রূহ’ দ্বারা জিবরীল (আঃ)ও উদ্দেশ্য হয়, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
﴿وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِينٍ﴾
“এটি রব্বুল আলামীনের নাযিল করা কিতাব৷ একে নিয়ে আমানতদার ‘রূহ’ (জিবরীল) অবতরন করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও, যারা (আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য) সতর্ককারী হয়, পরিস্কার আরবী ভাষায়”। (সূরা শুআরাঃ ১৯৩)
মানুষের শরীরে চলাচলকারী হাওয়াকেও ‘রূহ’ বলা হয়। আর আল্লাহ তাআলা যে ‘রূহ’ দ্বারা তাঁর অলীদেরকে শক্তিশালী করেন, তা হচ্ছে অন্য একটি রূহ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
﴿لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ ۚ أُولَٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ ۖ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللَّهِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾
“তোমরা কখনো এমন দেখতে পাবেনা যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদের ভাল বাসছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করেছে৷ তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র অথবা ভাই অথবা গোষ্ঠীভুক্ত হলেও তাতে কিছু আসে যায় না৷ আল্লাহ এসব লোকদের অন্তরে ঈমান বদ্ধমুল করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে একটি ‘রূহ’এর মাধ্যমে তাদের শক্তি যুগিয়েছেন৷ তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত থাকবে৷ তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে৷ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন৷ তারা আল্লাহর দলের লোক৷ জেনে রেখো আল্লাহর দলের লোকেরাই সফলকাম”। (সূরা মুজাদালাঃ ২২) অনুরূপভাবে মানুষের শরীরে সেই শক্তি থাকে, তাকেও ‘রূহ’ বলা হয়। বলা হয় চোখের রূহানী শক্তি, কানের রূহানী শক্তি, নাকের রূহানী শক্তি ইত্যাদি।
উপরোক্ত সবগুলো বিষয়ের চেয়ে অধিক একটি খাস (বিশেষ) জিনিষকে রূহ বলা হয়। সেটি হচ্ছে আল্লাহর মারেফতের (আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানের) শক্তি, আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, আল্লাহকে ভালবাসা এবং তা অর্জনের জন্য সুদৃঢ় হিম্মত ও ইচ্ছা পোষণ করা। এই রূহানী শক্তিকে রূহের দিকে সম্বোধিত করা শরীরের দিকে ‘রূহ’কে সম্বোধিত করার মতই। সুতরাং ইলম হচ্ছে রূহ, ইখলাসের (একনিষ্ঠতার) সাথে আল্লাহর এবাদত করা হচ্ছে এবাদতের রূহ, আল্লাহর মাহাব্বত রূহ, আল্লাহর উপর ভরসা করা ‘রূহ’ এবং সত্যবাদী হওয়াও ‘রূহ’।
এই ‘রূহ’গুলোর ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্ন স্তরভেদ রয়েছে। কোন কোন মানুষের মধ্যে এই রূহানী শক্তিগুলো জয়লাভ করে। ফলে সেই মানুষ রূহানী জগতের মানুষে পরিণত হয়। আবার কোন কোন মানুষ এগুলো হারিয়ে ফেলে কিংবা এর অধিকাংশই হারিয়ে ফেলে। তখন সে যমীনের পোকা-মাকড় ও পশুতে পরিণত হয়।
অনেক মনীষীর উক্তি থেকে জানা যায় যে, বনী আদমের তিনটি নাফ্স রয়েছে। নাফ্সে মুতমাইন্নাহ (শান্ত আত্ম), নাফ্সে লাওয়ামাহ (দোষারোপকারী আত্মা) এবং নাফ্সে আম্মারা (দুষ্ট আত্মা)। কারো উপর এগুলো থেকে কোন একটি নাফ্স জয়লাভ করে। আবার কারো কাছে অন্য একটি জয়লাভ করে। যেমন নাফ্সে মুতমাইন্নাহ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
﴿يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِيوَادْخُلِي جَنَّتِي﴾
“হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে এমন অবস্থায় যে তুমি সন্তুষ্ট এবং তোমরা রবের প্রিয়পাত্র৷ শামিল হয়ে যাও আমার নেক বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে”। (সূরা ফাজরঃ ২৭-৩০) নাফ্সে লাওয়ামাহ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
﴿وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ﴾
“আর না, আমি শপথ করছি তিরস্কারকারী নাফ্সের”। (সূরা কিয়ামাহঃ ২) নাফ্সে আম্মারা (মন্দ কাজে প্ররোচিতকারী নাফ্স) সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
﴿وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾
“আমি নিজের নফ্সকে দোষমুক্ত করছিনা। নাফ্স তো খারাপ কাজ করতে প্ররোচিত করে, তবে যদি কারোর প্রতি আমার রবের অনুগ্রহ হয় সে ছাড়া। অবশ্যই আমার রব বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান”। (সূরা ইউসুফঃ ৫৩)
তবে সঠিক কথা এই যে, নাফ্স একটিই। একই নাফসের একাধিক অবস্থা, বৈশিষ্ট ও স্বভাব রয়েছে। নাফ্সের কোন স্বভাব মানুষকে পাপ কাজের প্রতি প্ররোচিত করে। আল্লাহ, পরকাল এবং অন্যান্য গায়েবী বিষয়ের প্রতি ঈমান যখন সামনে এসে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, তখন তা লাওয়ামাহ তথা তিরস্কার ও দোষারোপকারীতে পরিণত হয়। নাফ্সের কোন কোন স্বভাব নাফ্সকে পাপ কাজের প্ররোচনা দেয়। ফলে নাফ্স পাপ কাজে লিপ্ত হয়। অতঃপর নাফ্সের লাওয়ামাহ নামক স্বভাব পাপ কাজের কারণে তিরস্কার করা শুরু করে। তার তিরস্কার করাটা হতে থাকে সৎকাজ না করার কারণে এবং অন্যায় কাজ বর্জন না করার কারণে। নাফ্সের মধ্যে ঈমান যখন শক্তিশালী হয়ে যায় এবং সৎকাজে আত্মনিয়োগ করে এবং পাপ কাজ বর্জন করে, তখন নাফ্স শান্তিময় তথা নাফ্সে মুতমাইন্নায় পরিণত হয়। এ জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যাকে তার সৎকাজ আনন্দ দান করে এবং পাপ কাজ কষ্ট দেয়, সেই মুমিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ
্রلاَ يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ ولاَ يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوضَةٌ بَعْدُগ্ধ
“যেনাকারী যখন যেনা করে তখন সে মুমিন থাকেনা, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকেনা। একই অবস্থা মদ পানকারীর। সে মদ পান করা অবস্থায় মুমিন থাকেনা। এর পরও তার জন্যে তাওবার দরজা উন্মুক্ত থাকে।
‘রূহ’ কি মৃত্যু বরণ করে?
‘রূহ’ মৃত্যু বরণ করে কি না? এ ব্যাপারেও লোকেরা মতভেদ করেছে। একদল লোক বলেছে রূহ মৃত্যু বরণ করে। কেননা রূহ হচ্ছে নাফ্স। প্রত্যেক নাফ্সই মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۖ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ﴾
“প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে। তারপর তোমাদের সবাইকে আমার দিকে ফিরিয়ে আনা হবে”। (সূরা আনকাবুতঃ ৫৭) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۖ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ ۗ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾
“প্রত্যেক নাফ্সকেই মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে৷ একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, যে সেখানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে৷ আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু”। (সূরা আল-ইমরানঃ ১৮৫) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
﴿كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ﴾
“ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি জিনিষই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তোমার মহীয়ান ও দয়াবান রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে”। (সূরা আর-রাহমানঃ ২৬-২৭) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
﴿وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ ۚ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ﴾
“এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদকে ডেকোনা৷ তিনি ছাড়া আর কোন সত্য মাবুদ নেই৷ সব জিনিষই ধ্বংস হবে কেবলমাত্র তাঁর সত্তা ছাড়। হুকুম করার অধিকার একমাত্র তাঁরই এবং তাঁরই দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে”। (সূরা কাসাসঃ ৮৮) এই মতের সমর্থকগণ বলেনঃ ফেরেশতাগণ যেখানে মৃত্যু বরণ করবে, তাই মানুষের রূহসমূহ মৃত্যুর আরো অদিক নিকটবর্তী।
অন্যরা বলেনঃ ‘রূহ’র মৃত্যু নেই। কেননা চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্যই ‘রূহ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। মৃত্যু হবে শুধু দেহের। মৃত্যুর পর ‘রূহ’কে আল্লাহ তাআলা পুনরায় দেহের মধ্যে ফেরত দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত ‘রূহ’এর শান্তি পাওয়া অথবা শাস্তি ভোগ করাই প্রমাণ করে যে, ‘রূহ’ মরেনা।
তবে সঠিক কথা হচ্ছে দেহ থেকে ‘রূহ’ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বের হয়ে যাওয়াই ‘রূহ’এর মৃত্যু। ‘রূহ’এর মৃত্যু দ্বারা যদি এই পরিমাণ বুঝানো হয়, তাহলে বলতে হবে যে, ‘রূহ’ অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ পাবে। আর যদি উদ্দেশ্য হয় যে, ‘রূহ’ একবারে ধ্বংস হয়ে যাবে, তাহলে বলতে হবে ‘রূহ’ কখনো এভাবে মরবেনা। বরং ‘রূহ’ সৃষ্টির পর থেকে চিরদিন নেয়ামত বা আযাব ভোগ করতেই থাকবে। এ বিষয়ে সামনে আরো আলোচনা আসছে। ইনশা-আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, জান্নাতীগণ﴿لَا يَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَىٰ ۖ وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ﴾ সেখানে তারা কখনো মৃত্যুর স্বাদ চাখবে না৷ তবে দুনিয়াতে যে মৃত্যু এসেছিল তা তো এসেই গেছে৷ আর আল্লাহ তাঁর করুণায় তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন”। (সূরা দুখানঃ ৫৬) এখানে যেই মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে দেহ থেকে ‘রূহ’ বিচ্ছিন্ন হওয়া। জাহান্নামীরা বলবেঃ﴿رَبَّنَا أَمَتَّنَا اثْنَتَيْنِ وَأَحْيَيْتَنَا اثْنَتَيْنِ فَاعْتَرَفْنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلْ إِلَىٰ خُرُوجٍ مِّن سَبِيلٍ﴾ “হে আমাদের রব, প্রকৃতই তুমি আমাদেরকে দু’বার মৃত্যু দিয়েছো এবং দু’বার জীবন দান করেছো৷ এখন আমরা অপরাধ স্বীকার করছি৷ এখন এখান থেকে বের হওয়ার কোন উপায় কি আছে? (সূরা মুমিনঃ ১১) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
﴿كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ۖ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ﴾
“তোমরা আল্লাহর সাথে কেমন করে কুফরীর আচরণ করতে পারো ৷ অথচ তোমরা ছিলে
প্রাণহীন, তিনি তোমাদের জীবন দান করেছেন৷ অতপর তিনি তোমাদের প্রাণ হরণ করবেন এবং অতঃপর তিনি তোমাদের জীবন দান করবেন৷ তারপর তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে”। (সূরা বাকারাঃ ২৮) আয়াতের অর্থ হচ্ছে তারা তাদের পিতাদের পৃষ্ঠদেশে এবং মাতাদের গর্ভে শুক্র আকারে ছিল। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জীবিত করেছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে মৃত্যু দান করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদেরকে পুনরায় জীবিত করবেন। কিয়ামতের দিনের পূর্বে তাদের ‘রূহ’এর কোন মৃত্যু হবেনা। অন্যথায় তিনবার মৃত্যু ঘটানো আবশ্যক হয়।
শিঙ্গাং ফুঁ দেয়ার সময় সমস্ত রূহ (সৃষ্টি) বেহুশ হওয়াতে তাদের মৃত্যু আবশ্যক হয়না। কেননা আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য আসবেন, তখন তারা বেহুশ হয়ে যাবে। আল্লাহর নূরে সমগ্র পৃথিবী জ্বলে যাওয়া মৃত্যু নয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে ইনশা-আল্লাহ। মুসা (আঃ) তুর পর্বতে বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। এটি তার মৃত্যু ছিলনা। ইসরাফীলের যেই ফুৎকারে মাখুলক বেহুশ হবে, তা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যারা এর পূর্বে মৃত্যুর স্বাদ চাখেনি, তাদের প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করানো। আল্লাহই ভাল জানেন।
কিন্তু যারা মৃত্যুর স্বাদ একবার ভোগ করেছে, অথবা যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারণই করা হয়নি, যেমন হুর-গিলমান এবং জান্নাতের অন্যান্য নেয়ামত, এগুলো থেকে কোন একটির দ্বিতীয়বার মৃত্যু হবে, কুরআনের আয়াতে এর কোন প্রমাণ নেই। আল্লাহই ভাল জানেন

উৎস:https://www.facebook.com/abdullahshahed.almadani/posts/582878835163321

বিষয়শ্রেণী: রোযা

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।"

সুরা বাকারা আয়াত ১৮৩

 

http://i0.wp.com/www.quraneralo.com/wp-content/uploads/2014/06/Iftar_timing.jpg

উৎস:http://www.quraneralo.com/sehri-and-iftar-timing/

আরো দেখুন >>

নোটিশ বোর্ড

আজ শাইখদের সময়সূচী

নিউজলেটারের জন্য নতুন নিবন্ধন করুন